মে দিবসের ভাবনা: ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস থেকে মর্যাদাপূর্ণ শ্রমজীবন -ফজলুল কবির মিন্টু

১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে যে ঐতিহাসিক শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা আজ প্রায় ১৪০ বছরের এক দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক। সেই আন্দোলনের রক্তঝরা ইতিহাস—হে মার্কেটের আত্মত্যাগ—বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে আলোকিত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বছর পরও আমরা কি সেই মৌলিক দাবিটি বাস্তবায়নে সফল হয়েছি?
বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের আশাবাদী হতে দেয় না। এখনো দেশের বহু খাতে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কোথাও নিয়মিত অতিরিক্ত সময় কাজ করানো হয়, কোথাও আবার শ্রম আইন উপেক্ষা করে দীর্ঘ কর্মঘণ্টাকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে। এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, রাষ্ট্রের কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োগের ঘাটতি স্পষ্ট। আইন থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল। দ্বিতীয়ত, মালিকপক্ষের একটি অংশ এখনো শ্রমিককে ব্যয় হিসেবে দেখে, মানবসম্পদ হিসেবে নয়। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর নামে কর্মঘণ্টা বাড়ানো হয়, কিন্তু শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্নটি গুরুত্ব পায় না। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। বর্তমান বাজারদরের তুলনায় তাদের মজুরি এত কম যে, শুধুমাত্র বেতনের ওপর নির্ভর করে ন্যূনতম জীবনযাপন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় অনেক শ্রমিকই বাধ্য হয়ে এমন কর্মক্ষেত্র বেছে নেন, যেখানে ওভারটাইমের সুযোগ রয়েছে। কারণ অতিরিক্ত কাজের মাধ্যমে পাওয়া সামান্য বাড়তি আয়ই তাদের জন্য বেঁচে থাকার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে ওঠে। ফলে একদিকে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি, অন্যদিকে জীবনধারণের তাগিদ—এই দ্বৈত বাস্তবতায় শ্রমিকরা যেন এক ধরনের ফাঁদে আটকে পড়েছেন।
তাই স্পষ্টভাবে বলা যায়, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শ্রমিকদের জন্য জীবনধারণ উপযোগী মজুরি (living wage) নিশ্চিত করা। যখন একজন শ্রমিক তার নিয়মিত কাজের সময়েই সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে, তখনই অতিরিক্ত কাজের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।
তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শ্রমিক আন্দোলনের পরিধি শুধু কর্মঘণ্টায় সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমের প্রকৃতি, প্রযুক্তি এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ফলে আজকের দিনে শ্রমিক অধিকারের প্রশ্নও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়ন এখন একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। কেবল মজুরি নয়, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা—সবকিছুর সঙ্গেই শ্রমিকের মর্যাদা জড়িত।
দ্বিতীয়ত, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোতে এখনো দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক। একটি টেকসই শিল্পায়নের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার।
তৃতীয়ত, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ অনুযায়ী শ্রমিকদের সংগঠন গঠন ও সম্মিলিত দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক শ্রমব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই অধিকার সীমিত বা বাধাগ্রস্ত হয়, যা শ্রমিকদের দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দেয়।
চতুর্থত, সম্মিলিত দরকষাকষি (collective bargaining) শক্তিশালী না হলে শ্রমিকের কণ্ঠস্বর কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয় না। ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিরাপত্তা—সবকিছুই এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরও সুষমভাবে নির্ধারিত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে মে দিবস আমাদের শুধু অতীতের সংগ্রামকে স্মরণ করায় না; এটি আমাদের বর্তমান বাস্তবতাকে মূল্যায়ন করতে এবং ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্র, মালিক ও শ্রমিক—এই তিন পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাষ্ট্রকে হতে হবে কার্যকর নিয়ন্ত্রক ও রক্ষক, মালিককে হতে হবে মানবিক ও দায়িত্বশীল, আর শ্রমিককে হতে হবে সংগঠিত ও সচেতন।
পরিশেষে বলা যায়, মে দিবসের মূল চেতনা শুধু কর্মঘণ্টা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক শ্রমজীবন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মে দিবসের আহ্বান আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিকই থাকবে।
(লেখকঃ সংগঠক, টিইউসি, কেন্দ্রীয় কমিটি)
