চলমান সংবাদ

১০ মিনিটে বুকসমান পানি: প্রবর্তকে ডুবে কোটি টাকার ক্ষতি, ব্যবসায়ীদের হাহাকার

– হিজড়া খালের কাজের ধীরগতি ও অস্থায়ী বাঁধে জলাবদ্ধতা বাড়ার অভিযোগ; দুই দিনে দুই দফা প্লাবনে বিপর্যস্ত নগরবাসী


“পানি হু হু করে ঢুকেছে। ১০ মিনিটের মধ্যে বুকসমান পানি হয়ে যায় দোকানে। কিছুই বের করতে পারিনি। আমি পথে বসে গেলাম”—কথাগুলো বলতে বলতে থেমে যান তানভির আহমেদ। চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক এলাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর প্রধান ফটকের সামনে তাঁর ‘আয়াত সার্জিক্যাল’ নামের দোকানটি এখনো পানির নিচে।

তাঁর দাবি, হঠাৎ ঢুকে পড়া পানিতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে প্রথম দফায় দোকান প্লাবিত হওয়ার পর আজ বুধবার বিকেলে আবারও পানি ঢুকে একই অবস্থা তৈরি হয়।

২০ এলাকায় জলাবদ্ধতা, ভোগান্তিতে পাঁচ লাখ মানুষ

মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ২০টি এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। রাস্তাঘাট, অলিগলি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পানিতে ডুবে গিয়ে নগরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো হাঁটু থেকে বুকসমান পানি জমে আছে। নালা-নর্দমার ময়লা পানিতে মিশে তৈরি হয়েছে দুর্গন্ধযুক্ত কালো স্রোত, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

“৫ ফুট উঁচু তাকও ডুবে গেছে”

তানভির আহমেদ বলেন,
“আমরা ভেবেছিলাম হাঁটুপানি হবে, তাই মালামাল তাকের ওপরে তুলছিলাম। কিন্তু পানি সেই উচ্চতাও ছাড়িয়ে যায়।”

তাঁর দোকানের প্রায় সব পণ্য পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর, নেবুলাইজার, ব্লাড প্রেশার মেশিন, অক্সিমিটারসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে। কম্পিউটার, সিসিটিভি, আইপিএস—সবই অকেজো।

ছোট ব্যবসায়ীদেরও বড় ধাক্কা

আয়াত সার্জিক্যালের পাশের ‘মা ড্রাগ হাউস’-এর কর্মচারী বিংকি দাশ জানান,
“এত বছরেও কখনো দোকানে পানি ঢোকেনি। এবারই প্রথম। নিচে রাখা সব ওষুধ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।”

চিকিৎসা চেম্বারও অচল

পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় একটি ভবনের নিচতলায় দন্তচিকিৎসক উম্মে রিফাত হাসনাত নাবিলার চেম্বারও পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। ডেন্টাল চেয়ার, স্কেলার মেশিন, অটোক্লেভসহ সব যন্ত্রপাতি পানিতে ডুবে গেছে।

পড়ুন:  চট্টগ্রামে এশিয়ান আবাসিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে “নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার” বিষয়ে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি সম্পন্ন

তিনি বলেন,
“সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে। কিন্তু কীভাবে, সেটাই বুঝতে পারছি না।”

খালের কাজ ও বাঁধ নিয়ে অভিযোগ

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রবর্তক এলাকার পেছনের হিজড়া খালে চলমান উন্নয়নকাজ এবং অস্থায়ী বাঁধের কারণে পানি নামতে পারেনি।

তানভির আহমেদ বলেন,
“খালে বাঁধ দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আগে খুলে দিলে এত পানি জমত না।”

সিডিএর ব্যাখ্যা

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-এর চেয়ারম্যান মো. নুরুল করিম বলেন,
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় হিজড়া ও জামালখান খালের কাজ এখনো চলছে। এসব খালে অস্থায়ী বাঁধ থাকায় কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

তিনি দাবি করেন,
“খালের কাজ শেষ হলে আগামী বর্ষায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা কমে যাবে।”

অনিশ্চয়তায় ব্যবসা পুনরুদ্ধার

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা এখন নতুন করে শুরু করার অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। সামনে বর্ষা মৌসুম থাকায় আবারও একই পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন তারা।

তানভির আহমেদ বলেন,
“ঋণ করে আবার শুরু করতে হবে। কিন্তু আবার যদি সব পানিতে ডুবে যায়—এই ভয়েই সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।”