বিজন ভাবনা (৪২): রাজনীতি – বিজন সাহা

বাংলাদেশের রাজনীতি মনে হয় বদ্ধ ডোবার মত। এক শ্রেণীর রাজনৈতিক দল সেখানে অনবরত জল ঘোলা করে আর সুযোগ মত সেই ঘোলা জলে মাছ ধরে, আরেক শ্রেণীর রাজনৈতিক দল জল ঘোলা দেখে দূরে সরে থাকে। যারা জল ঘোলা করে তারা মূলত ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি, যারা যথেষ্ট সফল ভাবে সাধারণ মানুষ নামের মাছদের শিকার করেই যাচ্ছে। আর বামপন্থী, প্রগতিশীল, সংস্কৃতি মনা মানুষ দিন দিন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এই নোংরা পরিবেশে রাজনীতি করতে পারছে না বলে। তবে এটা শুধু রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের ক্ষেত্রেই নয়, একটু শিক্ষিত, একটু স্বচ্ছল – সব ধরণের মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটছে। একদল মানুষ নিজেদের আরব বিশ্বের অংশ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে, আরেক দল ব্যস্ত নিজেদের পশ্চিমা সভ্যতার অংশ হিসেবে প্রমাণ করতে। প্রথম দল বাংলা ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতি অপছন্দ করে – তারা জোর করে এদেশে আরব্য সংস্কৃতি চালু করে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় আরও বেশি করে পোক্ত করতে চায়, এজন্য বাংলার বুক থেকে যা কিছু বাঙালি সব মুছে এখানে আরব্য সংস্কৃতি চালু করতে চায়। অন্য দল বাংলা, বাঙালিকে ভালবাসে, তবে বাংলার মানুষকে হয়তো ততটা ভালোবাসে না। তারা চায় পশ্চিমা বিশ্বের আলোকে দেখা পরিশোধিত সংস্কৃতি। আর বাংলার সাধারণ মানুষ তাদের মত করে থাকতে চায় – হাজার বছরের সমস্ত ভালোমন্দ নিয়েই। এ প্রসঙ্গে নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। ২০১৬ সালে দেশে ফিরছি। দুবাই এয়ারপোর্টে কয়েক ঘন্টার যাত্রা বিরতি। কোথাও বসার জায়গা নেই। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকবে দেখে এক ছেলে নিজের সীট ছেড়ে দিল। প্রথমে একটু আপত্তি করলেও বসে পড়লাম। ওদের সাথে আলাপ করে বুঝলাম ওরা এসেছে কাতার থেকে। কাজ করতে এসেছিল দুবাইয়ে। তবে ফুটবলে বিশ্বকাপের জন্য স্টেডিয়াম তৈরি করতে ওদের কাতার পাঠানো হয়। সেখানে ওভার টাইম কাজ করা যায় না, ফলে আয় কমে যায়। এ নিয়ে মনে ক্ষোভ ছিল। কিন্তু আসল সমস্যা খাবারে। ওদের প্রতিদিন ডাল আর রুটি দিত। ভারত আর পাকিস্তানের শ্রমিকরা সানন্দে খেত, কিন্তু ভাত না পেয়ে বাংলাদেশীদের মেজাজ সপ্তমে। কথা কাটাকাটি, মারামারি। এখন দেশে যাচ্ছে বহিষ্কৃত হয়ে। এরা তো গেল সাধারণ শ্রমিক। আমরা যারা যুগের পর যুগ বিদেশে থাকছি, ইউরোপিয়ান বা আমেরিকানদের মত চলাফেরা করছি – তাদের বেশিরভাগও কিন্তু কিছুদিন ভাত না পেলে প্রমাদ গনি। বেশ কিছু দিন বাংলায় কথা না বললে মনটা কেমন করে। যাদের সুযোগ আছে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়, না থাকলে অনলাইনে লেখে, কথা বলে। সেসব কথা একেবারেই মামুলি। কে কী খেল, কে কী বই পড়ল, কোথায় বেড়াতে গেল বা কি সিনেমা দেখল। অনেক সময় শুধুই সুপ্রভাত, শুভ রাত্রি। আসলে কী বলল সেটা বড় কথা নয়, এই যে বাংলায় বা নিজের মাতৃভাষায় দুটো কথা বলার বা লেখার সুযোগ পেল – সেটাই আসল কথা। অর্থাৎ আমরা যদি ভাবি সংস্কৃতি মানে শুধু পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, বাংলা গান, রবীন্দ্র সঙ্গীত, শহীদ মিনারে ফুল দেয়া তাহলে সেটা ভুল হবে। এই যে ভাত-মাছ খাওয়া, বাংলায় মত বিনিময় করা, দেশের জন্যে মন খারাপ করা এসবই সংস্কৃতির অংশ। তাই যারা ভাবে এসব বন্ধ করলেই বাঙালি সংস্কৃতি নাই হয়ে যাবে, দেশের সাধারণ মানুষ আরবদের মত সহি মুসলমান হয়ে যাবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। আসলে তারা নিজেরাও কখনোই পুরাপুরি বিদেশি হতে পারবে না – তা সে আরব হোক আর ইউরপিয়ায়ান বা আমেরিকান হোক।
এর সাথে রাজনীতির সম্পর্ক কি? চাই বা না চাই – মাছ ভাতের মতই ধর্মও আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুঁকে গেছে। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। অফিসে এসে জুতা বদলাচ্ছি। সাধারণত জুতা খুলে স্যান্ডেল পরি। একটু ঠাণ্ডা বলে অন্য এক জোড়া হালকা জুতা পরলাম। এরপর কী যে অস্বস্তি। কিছুতেই কারণ বুঝতে পারছিলাম না। পরে ভেবে দেখলাম – এটা এক অবচেতন অভ্যাসের কারণে। আগে ভাবিনি। ঐদিন খেয়াল করে দেখলাম আমি বাম পায়ের জুতা আগে পরি, পরে ডান পায়ের, আর খুলি বিপরীত – আগে ডান পায়ের জুতা, পরে বাম পায়ের। যখন জুতা খুলে স্যান্ডেল পরি তখন অসুবিধা হয় না, কিন্তু সেদিন জুতা খুলে জুতা পরায় ডান পায়ের জুতা আগে পরতে হয়েছে। আর এটাই অবচেতন ভাবে মনে এক অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। আমার ধারণা এরকম কোন না কোন অভ্যাস আমাদের সবারই আছে। একই ভাবে যারা নামাজ পড়ে, পূজা করে এক সময় এটা তাদের অভ্যাস হয়ে যায়। এটা অনেকটা সকালে উঠে চা বা কফি খাবার মত। না করলে দুনিয়া উল্টে যাবে না, কিন্তু মনের মধ্যে কী যেন করা হয়নি, কী যেন করা হয়নি এ ধরণের অস্বস্তি থেকে যাবে।
রাশিয়ায় মাছ ধরা এক জনপ্রিয় শখ। অনেকেই ঘর সংসার ভুলে মাছ ধরায় লিপ্ত থাকে। গ্রীষ্মে এদের দেখা যায় নদীর তীরে বড়শি হাতে অথবা ছোট নৌকায়। শীতে নদী বা লেকের মাঝে গর্ত করে সেখানে বড়শি ফেলে বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন। পাশে টেন্ট, ভোদকা আর টুকটাক খাবার। মাছ ধরা পড়ল বা না পড়ল সেটা বড় কথা নয়, নিজের মত করে কোয়ালিটি টাইম পাস করাই আসল। অনেকেই বাড়ি ফেরার সময় দোকান থেকে মাছ কিনে চলে যায়। অনেকের সংসার ভাঙে। তবে মাছ ধরুক আর নাই ধরুক সবাই কোন একদিন বিশাল মাছ ধরেছিল এই গল্প করতে ভুলে না। আমাদের কমিউনিস্টদের অবস্থাও অনেকটা রাশিয়ার শৌখিন মাছ শিকারীদের মত। রাজনীতি করার আনন্দে রাজনীতি করে। বামপন্থী দল বা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এটাই তাদের প্রধান গর্বের বিষয়। জেলেদের যেমন মাছের ভাগ্য নিয়ে মাথাব্যথা নেই এদেরও তেমনি জনগণের বা শ্রমিক কৃষকের ভাগ্য নিয়ে খুব একটা মাথা ব্যথা নেই। তারপরেও শখ বজায় রাখতে জেলেদের যেমন মাছ সংরক্ষণের জন্য গলা ফাটাতে হয়, নিজের রাজনীতিকে প্রাসঙ্গিক করার জন্য এরা শ্রমিক কৃষকের কথা বলে, বলে সেই ভাষায় যা শ্রমিক কৃষক বোঝে না।
বর্তমানে উন্নয়ন মানেই তথ্য প্রযুক্তি যা প্রকৃতির সাথে সংঘর্ষ পূর্ণ। তাহলে কি আমরা উন্নয়নের পথে হাঁটব না? অবশ্যই হাঁটব, তবে যতদূর সম্ভব প্রকৃতি সংরক্ষণ করে। উন্নয়নের জন্য, শ্রমিক কৃষকের জন্যেও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। তাই পরিবেশ রক্ষার কথা বলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বাধা দেয়া আসলে শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে কাজ করা। ২০১১ সালে দেশে বেড়াতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন আমার সাথে দেখা করেন। তারা তখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত। তাদের একটাই উদ্দেশ্য, আমি এর বিরুদ্ধে কিছু বলি। বললাম, “দেখুন মানুষ মাত্রেই মরণশীল। আমরা তো জন্মের বিরোধিতা করি না। বিমান দুর্ঘটনায় খুব কম লোক বাঁচে, তাই বলে আমরা বিমানের বিরোধিতা করি না, চেষ্টা করি দুর্ঘটনা কীভাবে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা যায়। তাই আপনাদের প্রতি একটা কথাই বলব। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনা ঘটে মানুষের ভুলে আর নিরাপত্তা খাতে ব্যয় কমানোর জন্য। আমাদের দেশের সব কলকারখানা নিরাপত্তা খাতে ব্যয় এড়িয়ে চলে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করুন, রূপপুরে নিরাপত্তা খাতে যেন ব্যয় সংকোচন করা না হয় সেটা নিয়ে কথা বলুন। তাহলেই দেখবেন মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ যাবে, কলকারখানা চলবে, মেহনতি মানুষের ঘরে খাবার থাকবে আর প্রকৃতিও শিনাতিতে থাকবে।” যাহোক আমার কথা তাদের পছন্দ হয়নি। কারণ এটা তাদের রাজনৈতিক আন্দোলন, রাজনীতিতে টিকে থাকার আন্দোলন।
আমাদের সন্তান বা প্রিয় মানুষ যদি প্রশ্নের উত্তর না দেয়, চুপ করে থাকে আমরা তখন বোঝার চেষ্টা করি কেন তারা এমন করছে। কারণ প্রতিবাদ শুধু চিৎকার করে বলা নয়, মৌনতাও প্রতিবাদ। সাধারণ মানুষ যদি আমাদের ডাকে সাড়া না দেয়, আমাদের প্রাপ্ত ভোট যদি ধর্তব্যের মধ্যে না হয় তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটা জনগণের নয়, আমাদের। আমরা যেমন প্রিয় মানুষকে বোঝার চেষ্টা করি, আমাদের দৃষ্টিতে ভুলত্রুটি প্রশ্রয় দিয়ে তাদের সাথে একজোগে কাজ করার চেষ্টা করি, সাধারন মানুষের ক্ষেত্রেও সেটাই করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি না যে সাধারন মানুষ, শ্রমিক, কৃষক নিজের স্বার্থ বোঝে না। বিগত কয়েক যুগে দেশের মানুষের, শ্রমিক কৃষকের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে, তাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পেয়েছে। হয়েছে মৌলবাদীদের পক্ষে, তাদের চেষ্টায়। এর মানে আমরা সাধারণ মানুষের রাজনীতি করার কথা বললেও তাদের পালস বুঝতে পারিনি, নিজেদের তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারিনি। আমরা প্রায়ই বাংলা ভাষা বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলি, হাজার বছরের ঐতিহ্য ইত্যাদি কথা বলি। ধর্মও তো তাই। ধর্মও হাজার বছর ধরে আমাদের রক্তে ধুকে গেছে, সংস্কৃতিতে ধুকে গেছে। ২০২১ সালে ভোলগা ভ্রমণের এক পর্যায়ে নিঝনি নভগোরাদের (গোর্কি) উপকণ্ঠে এক গ্রামের গির্জায় আসি। দুই বৃদ্ধা মহিলার সাথে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বর্তমান জীবন সম্পর্কে। ওনারা বলেন, “তখন অন্যান্য অনেক সুবিধা ছিল, কাজ ছিল, তরুণ প্রজন্ম গ্রাম ছেড়ে শহরে যেত না, কিন্তু আমরা চাইলেই ঈশ্বরকে ডাকতে পারতাম না। সেই স্বাধীনতা আমাদের ছিল না।” আমরা প্রায়ই বিভিন্ন ধরণের স্বাধীনতার কথা বলি। ধর্ম পালন করা ও না করার স্বাধীনতা এর মধ্যে থাকা দরকার বলেই মনে করি। এখনই সময় নিজেদের নতুন করে দেখার, যে শ্রমিক কৃষকের জন্য রাজনীতি করি তাদের কথা বোঝার, তাদের ভাষায় কথা বলার, তাদের বিশ্বাস অর্জন করার। সেটা করার জন্য বাম দল ও সিপিবিকে নিজেদের বদলাতে হবে। তবে বর্তমানে উদীচী, ছাত্র ইউনিয়নের কিছু কিছু অংশ ও কিছু কিছু পার্টি নেতাদের কিছু কিছু বক্তব্য শুনলে মনে হয় একদিন এরাও এনসিপি বা এবি পার্টির মত জামায়াতের ডি বা ই টীম হিসেবে পরিগণিত না হয়।
আজ পয়লা মে। সবাইকে মে দিবসের বিপ্লবী শুভেচ্ছা!
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো
