বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ: শ্রম আদালতের দীর্ঘসূত্রতা কি কমবে? -ফজলুল কবির মিন্টু
বাংলাদেশের শ্রমিকদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। চাকরিচ্যুতি, বকেয়া মজুরি, ক্ষতিপূরণ কিংবা অন্যান্য আইনগত পাওনা আদায়ের জন্য শ্রমিক আদালতে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়ার আগেই একজন শ্রমিক অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ শ্রম আইনে সংযোজিত ধারা ৩৪৮গ গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। এ ধারায় শ্রম-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত ও যৌথ বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ (Alternative Dispute Resolution Authority) গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে Conciliator ও Panel of Arbitrators থাকবে এবং ত্রিপক্ষীয় প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে একটি Governing Body গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
এতে কি শ্রম আদালতের চাপ কমবে?
সম্ভাবনা আছে, তবে তা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর।
বর্তমানে শ্রম বিরোধের একটি বড় অংশ সরাসরি আদালতে গিয়ে জমা হয়। নতুন কর্তৃপক্ষ যদি আদালতের বাইরে দ্রুত মধ্যস্থতা (Conciliation) এবং প্রয়োজন হলে সালিশ (Arbitration)-এর মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে, তাহলে অনেক মামলা শ্রম আদালতে যাওয়ার আগেই শেষ করা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে বকেয়া মজুরি, ওভারটাইম, ছুটির টাকা, সার্ভিস বেনিফিট, ক্ষতিপূরণসহ যেসব বিরোধের তথ্য ও পাওনার হিসাব তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, সেগুলো দ্রুত ADR-এর মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
তবে শুধু একটি নতুন কর্তৃপক্ষ গঠন করলেই দীর্ঘসূত্রতা দূর হবে না। বরং নতুন কর্তৃপক্ষ নিজেই যদি দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে, তাহলে সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে নতুন সমস্যা তৈরি হবে।
সফল করতে যা প্রয়োজন
প্রথমত, প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। অভিযোগ গ্রহণ থেকে Conciliation এবং Arbitration—সবকিছুর জন্য আইনগত deadline প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, Conciliator ও Arbitrator হতে হবে যোগ্য, দক্ষ ও নিরপেক্ষ। তাদের শ্রম আইন, শিল্প সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক শ্রমমান সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, শ্রমিকের জন্য প্রক্রিয়াটি হতে হবে সহজ, কম খরচের এবং সহজপ্রাপ্য। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা হলে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাবেন না। চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলে আঞ্চলিক কার্যক্রম থাকা প্রয়োজন।
চতুর্থত, কোনো সমঝোতা যেন শ্রমিককে তার আইনগত পাওনা থেকে বঞ্চিত করে না হয়। দ্রুত নিষ্পত্তি মানে কম পাওনায় আপস নয়; দ্রুত ও ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি।
পঞ্চমত, ADR Authority-এর সিদ্ধান্ত বা award বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। নইলে শ্রমিককে award পাওয়ার পরও আবার আদালতে যেতে হলে ADR-এর মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
শ্রম আদালতের বিকল্প নয়, সহায়ক ব্যবস্থা
ADR Authority-কে শ্রম আদালতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি হওয়া উচিত শ্রম আদালতের ওপর চাপ কমানোর একটি সহায়ক ব্যবস্থা।
যেসব বিরোধ দ্রুত সমঝোতা বা সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেগুলো ADR-এর মাধ্যমে শেষ করা গেলে শ্রম আদালত জটিল ও বিচারিকভাবে নিষ্পত্তিযোগ্য মামলাগুলোতে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।
একই সঙ্গে ইতোমধ্যে শ্রম আদালতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা মামলাগুলোর মধ্য থেকেও উভয় পক্ষের সম্মতিতে দ্রুত নিষ্পত্তিযোগ্য মামলাগুলো ADR-এর আওতায় আনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
শেষ কথা
ধারা ৩৪৮গ শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করবে সময়-সীমাবদ্ধ কার্যক্রম, দক্ষ ও স্বাধীন Conciliator ও Arbitrator, শ্রমিকবান্ধব প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থার ওপর।
এসব নিশ্চিত করা গেলে শ্রম আদালতে নতুন মামলার চাপ কমবে এবং বহু শ্রমিক দীর্ঘদিনের মামলা থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
অন্যথায় শুধু নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন হবে—দীর্ঘসূত্রতার সমস্যার সমাধান হবে না।