বিজন ভাবনা (৬৯): দালাল -বিজন সাহা
জয় বাংলা স্লোগান নিয়ে বিতর্ক যেন থামছেই না। কমিউনিস্ট পার্টি জয় বাংলা স্লোগান দেবে নাকি কমিউনিস্ট পার্টির জয় বাংলা স্লোগান দেয়া উচিৎ নয় সে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কেউ বলছে আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদী জয় বাংলা স্লোগান দিতে পারে না, আবার কেউ বলছে জয় বাংলা স্লোগান মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের পার্টি হিসেবে, যেখানে আমাদের কমরেডরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে যুদ্ধ করেছে, এমনকি অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে, সেখানে জয় বাংলা স্লোগান অস্বীকার করা হবে তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। স্লোগান নিয়ে এই বিতর্কে শ্রেণী সংগ্রামের বিষয়টি নতুন করে সামনে চলে এসেছে। সিপিবি সমাজতন্ত্রের জন্য লড়াই করে, সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের লড়াইয়ে মূল স্লোগান “দুনিয়ার সর্বহারা এক হও।” ১৮৪৮ সিলের কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে প্রোলেটারিয়েট বা সর্বহারা শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন সময়ে এই স্লোগান পরিবর্তিত হয়েছে। সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেনিন বা মাও নিজেরাই এর পরিবর্তন করেছেন বা এই স্লোগানের পরিপূরক হিসেবে নতুন স্লোগান সামনে এনেছেন। বাংলাদেশে এই স্লোগান পরিবর্তিত রূপ পেয়ে হয় “দুনিয়ার মজদুর এক হও।” মজদুর সর্বহারা নয় শ্রমিক। বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি সর্বহারা বা শ্রমিকদের এক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যখন শ্রেণী সংগ্রামের ডাক দেয় তখন স্বাভাবিক ভাবেই যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসে তা হল পার্টির নেতারা কোন শ্রেণীর প্রতিনিধি? কয়েক দশক আগেও সিপিবির নেতৃত্বের একটি বড় অংশ পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেরা শ্রেণীচ্যুত হয়ে সর্বহারা হতেন। এখন কি সেটা ঘটে? বর্তমানের অধিকাংশ নেতাই মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত। এমনকি কেউ কেউ উচ্চবিত্ত। এবং তা শুধু জন্মসূত্রে বা মনমানসিকতায় নয়, জীবনযাত্রায়, চলনে বলনে, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে। এমতাবস্থায় নেতারা যখন শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলে, তখন প্রশ্ন আসে তারা কোন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে? তারা কি সত্যিকার অর্থেই শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি চায়? নাকি শ্রমিক শ্রেণীর দুর্দশাকে পুঁজি করে রাজনীতি ব্যবসা করে?
“কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার জন্য রাজনীতি করবে, অন্য দলের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য যারা কাজ করবে তারা কমিউনিস্ট নয়” এরকম স্ট্যাটাস ফেসবুকে এখন হরহামেশা দেখা যায়। এই ধরণের বক্তব্য যারা রাখেন তারা মনে হয় রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া। কারণ আমরা কোন আইসোলেট সোসাইটিতে বাস করি না। আমাদের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ কাউকে লাভবান আবার কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই ভুল আমরা করতাম সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে। ভাবতাম সোভিয়েত ইউনিয়ন মানেই দুর্নীতি মুক্ত, শোষণ মুক্ত। আমরা ভুলে যেতাম যে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বেরই একটি দেশ মাত্র, সেখানেও আমাদের মত লোকজন বাস করে যাদের কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসা, হিংসা সবই আছে। আর যখন এসব থাকে তখন মানুষের মধ্যে অন্যায় করার প্রবণতাও থাকে। এটা একান্তই মানবিক। কিন্তু প্রশ্ন অন্য জায়গায়। গরু ছাগল বাদই দিলাম, ২০২৪ সালে এমনকি ইঁদুর বিড়াল পর্যন্ত জানত যে হাসিনার পতন হলে তার জায়গায় আসবে জামায়াত, বড়জোর বিএনপি। এ জন্য রকেট সাইন্স পড়ার দরকার নেই। শুধু বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে বিভিন্ন দলের সাংগঠনিক শক্তির দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যেত। তারপরেও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার দরকার ছিল, সিপিবি সেটা করেছে। সেই লড়াইয়ের ফলাফল আমরা জানি। সিপিবিকে শিখণ্ডী হিসেবে ব্যবহার করে জামায়াত শিবির ক্ষমতা দখল করেছে। হ্যাঁ, সিপিবি সত্যিকার অর্থেই শিখণ্ডীর ভূমিকা পালন করেছে। কারণ শুধু জামায়াত শিবিরের ডাকে দলমত নির্বিশেষে সারা বাংলাদেশ রাজপথে নামত না। সিপিবি, উদীচী, ছাত্র ইউনিয়ন এসব সংগঠনকে দেখেই স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ সেদিন রাস্তায় নেমেছিল, বাধ্য করেছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে। অনেকেই বলতে পারে শেখ হাসিনার পদত্যাগের বা দেশত্যাগের পেছনে আর্মি ছিল। তবে সর্বস্তরের জনগণের রাস্তায় নামার পেছনে সিপিবি ও উদীচী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এতে করে তারা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে পারেনি। বরং দেশ শাসনের ভার তুলে দিয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাতে। এমনকি বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকলেও পেছন থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে মৌলবাদীরাই। কিন্তু এখন যখন মুক্তিযুদ্ধ বিপন্ন, জয় বাংলা স্লোগান প্রায় নিষিদ্ধ তখন পাছে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পায় এই অজুহাতে সিপিবি এই লড়াই থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। নতুন করে বলার নেই যে মৌলবাদী শক্তি আরও অনেক বেশি স্বৈরাচারী। তাই প্রশ্ন আসে সিপিবি কার পক্ষে – স্বাধীনতাকামী শক্তির পক্ষে নাকি স্বাধীনতাবিরোধীদের পক্ষে? সিপিবি একাত্তরের পক্ষে নাকি চব্বিশের পক্ষে? তারা ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের পক্ষে নাকি শারিয়া শাসনের পক্ষে? সিপিবির বর্তমান নেতৃত্বের কথাবার্তা মানুষের মনে এই ধরণের প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সিপিবির নেতা যখন “যারা জয় বাংলা স্লোগান দেয় তারা আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করছে” বলে অভিযুক্ত করে তখন প্রশ্ন জাগে সিপিবির নেতৃত্ব কি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আস্থা রাখে? যদি রাখে তাহলে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করা বা না করার দায়িত্ব জনগণের হাতে ছেড়ে না দিয়ে সে নেয় কেন? যে গণতন্ত্রের জন্য তাদের আন্দোলন সেই গণতন্ত্রের উপর আস্থা রেখে তারা কেন বলে না কোন দল রাজনীতি করবে কি করবে না সেটা জনগণই ঠিক করুক। এর আগে বিভিন্ন নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় সিপিবি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি এই অজুহাতে যে নির্বাচন যথেষ্ট প্রতিনিধিত্বমুলক নয়। তাহলে এবার অংশ নিল কেন? ২০২৪ সাল থেকে সিপিবির কথা ও কাজে এতটাই অসামঞ্জস্য যে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না কোনটা সিপিবির মুখ আর কোনটা তার মুখোস। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে লিখি “আমার মনে হয় নিরপেক্ষ জনমত জরিপ করলে দেশের শ্রমিক কৃষকের একটি বড় অংশ জয় বাংলার পক্ষে বলবে। আর কত বড় হলে সিপিবি নেতৃত্ব বুঝবে যে বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিকের কাছে দুনিয়ার মজদুর এক হও এর চেয়ে জয় বাংলা অনেক বেশি আপন। সিপিবি যদি এদেশের শ্রমিক, এদেশের কৃষকের রাজনীতি করতে চায় তাহলে তাকে জয় বাংলা মেনে নিয়েই সেটা করতে হবে।” এর উত্তর পাই – “এ দেশে জয় বাংলার চেয়ে নারায়ে তকবির বেশি জনপ্রিয়। তাই সিপিবি দুনিয়ার মজদুর এক হও স্লোগানে অবিচল থাকবে।” ভালো কথা। কেউ তো দুনিয়ার মজদুর এক হও অস্বীকার করতে বলছে না, আমরা বলছি এই মুহূর্তে যখন দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এসব বিপন্ন তখন জয় বাংলা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। আর নারায়ে তকবির বা অন্য যেকোনো ধর্মীয় স্লোগান যতই জনপ্রিয় হোক না কেন – আদর্শিক কারণেই সিপিবি সেই রাজনীতির বিরোধিতা করবে।
একটা অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে আওয়ামী লীগ জয় বাংলা স্লোগানটি অপব্যবহার করে পচিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আপনি যদি জয় বাংলা স্লোগানকে নিজের মনে করেন তাহলে সেটা আওয়ামী লীগকে দখল করতে দিলেন কেন? আপনি যদি নিজের অধিকারটুকু আদায় করতে না পারেন, যে স্লোগানের ভাগীদার নিজে সেটা ধরে রাখতে না পারেন, তাহলে মেহনতি মানুষের অধিকার আদায় করবেন কীভাবে? কেন মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে? মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে, অস্ত্র হাতে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছেন এই বলে গর্ব করার পরেও যদি এই স্বাধীনতা হাতছাড়া করার জন্য এ পায়ে দাঁড়িয়ে থাকেন – তাহলে কীভাবে আপনি মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে সৈনিক হবেন? একসময় মনে হত স্বৈরাচার আমাদের রাজনীতিতে ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে পড়েছে। এখন দেখি স্বৈরাচার সংক্রামক ব্যাধি। কারণ প্রতিটি মানুষ যার সামান্য ক্ষমতাও আছে সে সেটার অপব্যবহার করতে দ্বিধা করে না। যখন সিপিবির নেতা কর্মী শুভানুধ্যায়ীরা সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের প্রতিবাদ করছে, তখনও তিনি ভাঙ্গা রেকর্ডের মত বেজেই যাচ্ছেন। এটাই কি স্বৈরাচার নয়। স্বৈরাচার শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলেই প্রকাশ পায় না, সেটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত দেখতে পাই। যে মানুষ ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিক জীবনে, নিজের দলে স্বৈরাচারী আচরণ করে সে কীভাবে ন্যায়পরায়ন শাসক হবে? বামদের আসলে স্বৈরাচার নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি না করাই ভাল। কারণ প্রতিটি সমাজতান্ত্রিক দেশেই গণতন্ত্রের আকাল ছিল। এমনকি আপনারাও ক্ষমতায় গেলে নিজেদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য স্বৈরাচারী হতে বাধ্য হবেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এসব দেশের ইতিহাস সেটাই বলে। খেয়াল করলে দেখবেন সারা বিশ্বে ইসলাম স্থানীয় রীতিনীতি গ্রহণ করলেও ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলাদেশের ইসলাম স্থানীয় সংস্কৃতি অস্বীকার করে আরবি ইসলাম হতে চায়। আমাদের বামেরাও স্থানীয় বাস্তবতা আমলে না এনে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনের বুট পরে এগিয়ে যেতে চায়। তবে সেটা হবে শিকড় বিহীন, শূন্যের উপর ভেসে থাকা। ধর্মীয় নেতারা বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিরোধিতা করলেও বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বলেই তারা আজ ধর্ম প্রচার বা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করলেও মনে হয় আওয়ামী লীগই বর্তমান পরিস্থিতিতে সিপিবির জন্য লাইফ জ্যাকেট হিসেবে কাজ করবে। আওয়ামী লীগের প্রাসঙ্গিকতা বামদের উপর নির্ভর করবে না, তবে বাংলাদেশে বাম রাজনীতি থাকবে কি থাকবে না সেটা অনেকাংশেই নির্ভর করবে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসবে কি আসবে না তার উপর। কারণ এখনও পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শক্তিশালী উপস্থিতিই বাংলাদেশের রাজনীতিকে গণতন্ত্রের ছোঁয়াচ দিতে পারে। আর এদের শক্তিশালী অবস্থান ছাড়া বাম দলগুলো রাজনীতির রাস্তার ধারেই রয়ে যাবে। জীবনে যেমন সাফল্যের কোন শর্টকাট নেই রাজনীতিতেও তাই। এটা সিপিবি নেতৃত্ব যত দ্রুত বুঝতে পারে ততই মঙ্গল।
অনেককেই বলতে শুনি যে সিপিবির একটি অংশ যদি লীগের দালালি না করত তাহলে বর্তমানে এই অবস্থা হত না। কিন্তু সিপিবি কবে দালাল না ছিল। ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি মস্কোয় বৃষ্টি হলে কমরেডরা ঢাকায় ছাতা ধরে। এখন কাউকে বলে আওয়ামী লীগের দালাল, কাউকে শিবিরের বা ডিপ স্টেটের দালাল। আসলে দেশে মনে হয় সবাই দালাল – কেউ ভারতের, কেউ পাকিস্তানের, কেউ রাশিয়ার, কেউ চীনের, কেউ আমেরিকার। দালাল হতে দোষ নেই, কে কার দালাল হচ্ছে সেখানেই যত সমস্যা। দুঃখ যে বাংলাদেশের কোন দালাল নেই। অবশ্য থাকবেই বা কি করে? বাংলাদেশ তো গরুর মত। সবাই তাকে বিক্রি করতে চায়। কেউ চোরাই পথে – হাড্ডিসার গরুর মত, কেউ বা খাইয়ে পরিয়ে নাদুশ নুদুশ করে মেলায়। বামেরা হয়ত সেটা বন্ধ করতে পারত। তবে সেজন্য দরকার বৃহত্তর বাম ঐক্য। কিন্তু যেখানে সিপিবি নিজেই দ্বিধাবিভক্ত সেখানে বৃহত্তর ঐক্য সুদূরপরাহত। অন্তত বর্তমান নেতৃত্ব দিয়ে সেটা অসম্ভব।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো