যে গল্পগুলো লেখা হয়নি-৮ -ফজলুল কবির মিন্টু
ইমাম উদ্দিন কি ঈদ করবে না?
ঘটনাকাল: ১৯ এপ্রিল ২০২৩
ইমাম উদ্দিন চট্টগ্রামের একটি স্বনামধন্য গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পোশাক শ্রমিক ছিল। প্রায় ১১-১২ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছে সে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় কেটে গেছে কারখানার মেশিনের শব্দ, কাজের চাপ আর মাস শেষে বেতনের অপেক্ষায়।
কিন্তু প্রায় ৯-১০ মাস আগে হঠাৎ এক দুর্ঘটনা ইমামের জীবনের হিসাবটা বদলে দেয়। কিছুদিন কাজ করতে পারেনি সে। আর সেই সুযোগেই হারিয়ে যায় তার দীর্ঘদিনের চাকরি।
চাকরি চলে গেছে—কিন্তু ইমামের পাওনা তো আর চলে যায়নি।
দীর্ঘদিনের চাকরির কিছু সার্ভিস বেনিফিট এবং অব্যবহৃত অর্জিত ছুটির টাকা পাওনা ছিল তার। সেই টাকা পাওয়ার জন্য ইমাম অনেক দেন-দরবার করেছে। বারবার অফিসে গেছে, কথা বলেছে, অপেক্ষা করেছে।
অবশেষে তাকে বলা হয়েছিল—
“রোজার আগেই টাকা দিয়ে দেওয়া হবে।”
ইমাম অপেক্ষা করল।
রোজা শুরু হলো। টাকা এলো না।
এবার বলা হলো—
“ঈদের আগেই পেয়ে যাবেন।”
ইমাম আবারও বিশ্বাস করল। কারণ সামনে ঈদ। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু কেনাকাটা করবে—এমন একটা ছোট্ট স্বপ্ন বুকের মধ্যে লালন করছিল সে।
কিন্তু ঈদও যখন একেবারে দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন ১৯ এপ্রিল ইমামকে জানানো হলো—
“ঈদের পরে টাকা দেওয়া হবে।”
কথাটা শুনে ইমামের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
সে আমাকে ফোন করল।
কণ্ঠটা কেমন যেন ভারী হয়ে এসেছিল।
বলল,
“মিন্টু ভাই, টাকাগুলো পেলে পরিবারের সবার জন্য ঈদের কাপড় কিনব ভেবেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, আমাদের কপালে ঈদ নাই।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
“গরিব হয়ে জন্ম নেওয়াটাই বোধ হয় আমাদের পাপ।”
আমি ফোনের ওপাশে বসে ইমামের কথাগুলো শুনছিলাম।
ভাবছিলাম—একজন মানুষ ১১-১২ বছর একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিল। তার জীবনের যৌবনের একটা বড় অংশ একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে ব্যয় হলো। চাকরি হারানোর পরও সে তার আইনসঙ্গত পাওনা চায়—ভিক্ষা নয়, দয়া নয়।
সে শুধু নিজের প্রাপ্যটুকু চায়।
আর সেই প্রাপ্যটুকু পাওয়ার জন্যও তাকে ঈদের আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তারপর ঈদের ঠিক আগে শুনতে হয়—“ঈদের পরে।”
অথচ ঈদ তো কেবল নতুন জামাকাপড়ের নাম নয়।
ঈদ মানে সন্তানের মুখে হাসি দেখা।
ঈদ মানে পরিবারের জন্য সামান্য কিছু কেনাকাটা।
ঈদ মানে অভাবের মধ্যেও কয়েকটি দিনের আনন্দ।
ইমামের সেই আনন্দটুকুও যেন পাওনা টাকার সঙ্গে আটকে গেল।
ইমামের মালিক চট্টগ্রামে একজন দানশীল মানুষ হিসেবে বেশ পরিচিত। নিশ্চয়ই তিনি প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জাকাত দেন। অনেক মানুষ তার দানে উপকৃত হন—এমন কথাও শোনা যায়।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায়—
যে শ্রমিক বছরের পর বছর তার প্রতিষ্ঠানের জন্য শ্রম দিয়েছে, তার ন্যায্য পাওনাটা সময়মতো পরিশোধ করাও কি এক ধরনের দায়িত্ব নয়?
জাকাতের টাকা হয়তো অনেকের মুখে হাসি ফোটায়।
কিন্তু ইমাম উদ্দিনের পাওনা টাকাটা তার নিজের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত অধিকার।
সেই অধিকার পাওয়ার জন্য তাকে কেন ঈদের আগের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?
ইমাম কি ঈদ করবে না?
নাকি গরিবের ঈদও এখন তার পাওনা টাকার মতোই—
“ঈদের পরে” পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবে?