যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–১ – ফজলুল কবির মিন্টু

আমার ট্রেড ইউনিয়ন জীবন খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের পথচলায় যে কাজটি আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ, আগ্রহ এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে করে আসছি, সেটি হলো—শ্রমিকদের গ্রীভ্যান্স সাপোর্ট দেওয়া, অর্থাৎ তাদের অভিযোগ, সমস্যা ও শ্রম-আইনসংক্রান্ত বিষয়ে পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজন হলে আইনগত সহায়তা করা।

এই কাজ করতে গিয়ে কত শ্রমিকের কত বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি, তার সবকিছু লিখে রাখা সম্ভব হয়নি। কিছু ঘটনা কাগজে আছে, কিছু নথির ভাঁজে হারিয়ে গেছে, আর কিছু থেকে গেছে শুধু স্মৃতিতে।

আজ হঠাৎ তেমনই একটি ঘটনা মনে পড়ছে। ঘটনাটি খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু আমার কাছে এটি ছিল মজার, ব্যতিক্রমী এবং একই সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় বুদ্ধি ও কৌশলের প্রয়োজনীয়তার একটি চমৎকার শিক্ষা।

আমাদের সংগঠনের একজন কর্মীর নাম ছিল স্বপন।

একদিন স্বপন আমার কাছে এসে তার হাতে থাকা একটি কারণ দর্শানো নোটিশ দেখাল। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ তাকে নোটিশটি দিয়েছে। অভিযোগ—গত এক বছরে সে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ অভিযোগের ভাষায়, তার অনুপস্থিতি ছিল প্রায় অভ্যাসগত।

নোটিশটি পড়ে আমি স্বপনের দিকে তাকালাম।

—“কী ব্যাপার? অভিযোগটা কি সত্যি?”

স্বপন খুব একটা রাখঢাক না করেই বলল,

—“ভাই, মোটামুটি সত্যি।”

এবার আমি একটু থমকে গেলাম।

কারণ, শ্রমিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তাহলে সেই অভিযোগের জবাব তৈরি করা সহজ কাজ নয়। মিথ্যা অভিযোগ হলে একরকম লড়াই করা যায়—তথ্য, প্রমাণ ও যুক্তি দিয়ে অভিযোগকে খণ্ডন করা যায়। কিন্তু অভিযোগ সত্য হলে?

তখন সরাসরি ‘আমি করিনি’ বলা যায় না। আবার সত্য স্বীকার করেও এমনভাবে জবাব দিতে হয়, যাতে শ্রমিকের পক্ষে ন্যায়সংগত অবস্থান তৈরি করা যায়।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা—এই পথে আমি যাব না।

বরং অন্যভাবে বিষয়টিকে দেখতে হবে।

আমি স্বপনের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে শুরু করলাম। জানতে চাইলাম, তার কর্মস্থলে প্রতিদিন কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়? সাপ্তাহিক ছুটির দিন কি কাজ করানো হয়? অতিরিক্ত কাজের জন্য ওভারটাইম দেওয়া হয় কি না? কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে কত সময় লাগে?

স্বপন যা বলল, তাতে গল্পটা ধীরে ধীরে অন্যরকম হয়ে উঠল।

তার ভাষ্যমতে, কারখানায় নিয়মিত ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। শুধু তাই নয়, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও তাকে অনেক সময় কাজ করতে হতো।

আমি হিসাব করতে শুরু করলাম।

প্রতিদিন যদি ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কারখানায় কাটাতে হয়, তার সঙ্গে কর্মস্থলে যাওয়া-আসার প্রায় দুই ঘণ্টা যোগ করলে দিনে মোট ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় চলে যাচ্ছে শুধু চাকরির পেছনে।

তাহলে মানুষের নিজের জন্য থাকে কতটুকু?

ঘুম, খাওয়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, ব্যক্তিগত প্রয়োজন—সবকিছুর জন্য বাকি থাকে মাত্র কয়েক ঘণ্টা।

স্বপনের আরেকটি কথা আমাকে আরও ভাবিয়ে তুলল।

কাজে যেতে কোনো দিন যদি ১৫-২০ মিনিট দেরি হতো, তাকে আর কারখানায় ঢুকতে দেওয়া হতো না।

অর্থাৎ দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ, যাতায়াতে দীর্ঘ সময়—এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু ১৫-২০ মিনিট দেরি হলে শ্রমিকই অপরাধী!

আরও একটি বিষয় ছিল।

স্বপনকে ‘লাইন সুপারভাইজার’ নামের একটি পদে রাখা হয়েছিল। নামের দিক থেকে এটি অফিস স্টাফের পদ। কিন্তু বাস্তবে তার কাছ থেকে নিয়মিত আট ঘণ্টার বেশি কাজ নেওয়া হতো এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করানো হতো। অথচ এসব অতিরিক্ত কাজের জন্য তাকে কোনো ওভারটাইম ভাতা দেওয়া হতো না।

তখন আমার মাথায় একটা ভাবনা এলো।

কর্তৃপক্ষ যদি সময়ের হিসাব দিয়ে স্বপনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করাতে পারে, তাহলে সেই সময়ের হিসাব দিয়েই তো স্বপনের পক্ষে প্রশ্ন তোলা যায়!

আমি স্বপনকে বললাম,

—“অভিযোগ অস্বীকার করার দরকার নেই। বরং ওদের নিজেদের হিসাবের মধ্যেই ওদের প্রশ্নটা ফিরিয়ে দিই।”

এরপর আমি কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব লিখতে বসলাম।

জবাবের শুরুতেই আমি একটি সরল প্রশ্ন তুললাম—কর্তৃপক্ষ বলছে, স্বপন গত এক বছরে ৩০/৩৫ দিন অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু ঠিক কোন কোন তারিখে সে অনুপস্থিত ছিল, সেটি নোটিশে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অভিযোগের নির্দিষ্টতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।

তারপর আসল কথায় এলাম।

বললাম, প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। কর্মস্থলে যাওয়া-আসায় আরও প্রায় দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন একজন শ্রমিককে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় শুধু প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে।

দিনের বাকি সময়টুকুতে তাকে খাওয়া, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো এবং ঘুমানোর কাজ করতে হয়।

এরপর যদি কোনো দিন ১৫-২০ মিনিট দেরি হয় এবং সেই কারণে তাকে কর্মস্থলে ঢুকতে না দেওয়া হয়, তাহলে সেটিকে নিছক ‘অনুপস্থিতি’ হিসেবে দেখার আগে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মব্যবস্থার দিকটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আরও বললাম, স্বপনকে লাইন সুপারভাইজার হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে তাকে নিয়মিত আট ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু সেই অতিরিক্ত কাজের জন্য তাকে ওভারটাইম ভাতা দেওয়া হয়নি।

তারপর জবাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এল।

আমি যুক্তি দিলাম—একজন শ্রমিক প্রতিদিন যদি চার থেকে ছয় ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করে এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করে, তাহলে এক বছরে তার করা অতিরিক্ত শ্রমের পরিমাণও তো হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। সেই হিসাব করলে কর্তৃপক্ষ যে ৩০/৩৫ দিনের অনুপস্থিতির অভিযোগ তুলেছে, তার বিপরীতে স্বপনের অতিরিক্ত কাজের পরিমাণ হয়তো তার চেয়েও অনেক বেশি দাঁড়াবে।

অতএব, বিষয়টিকে শুধু ‘অনুপস্থিতি’ হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতাটা দেখা হবে না।

শেষে লিখলাম, শ্রমিকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি প্রত্যাহার করে তার প্রতি মানবিক আচরণ করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি বিনীত অনুরোধ।

জবাবটি দেওয়ার পর আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম।

তারপর আশ্চর্যজনকভাবে আর কোনো খবর নেই।

কর্তৃপক্ষ আর কোনো পদক্ষেপ নিল না।

স্বপনও চাকরিতে বহাল থাকল। শুধু তাই নয়, সে আরও অনেকদিন সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছে।

পরে যখন ঘটনাটি নিয়ে ভাবতাম, আমার কাছে সবচেয়ে interesting লাগত একটা বিষয়।

একটি কারণ দর্শানো নোটিশ—যেটি হয়তো স্বপনের চাকরি হারানোর প্রথম ধাপ হতে পারত—সেটিই শেষ পর্যন্ত আর সামনে এগোল না।

আমাদের দেশের অনেক কর্মক্ষেত্রে কারণ দর্শানো নোটিশ কখনো কখনো সত্যিকার অর্থে শ্রমিকের বক্তব্য জানার জন্য দেওয়া হয় না। বরং অনেক সময় আগে থেকেই নেওয়া সিদ্ধান্তকে একটি ‘প্রক্রিয়ার’ মধ্য দিয়ে বৈধ রূপ দেওয়ার জন্য নোটিশটি ব্যবহৃত হয়। অভিযোগ, জবাব, তদন্ত, শুনানি—সবশেষে শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করার পথটি যেন কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ করা হয়।

স্বপনের ক্ষেত্রেও হয়তো তেমন কিছুই অপেক্ষা করছিল।

কিন্তু এবার সেই পথটা সহজ হলো না।

কারণ আমরা অভিযোগের সত্য-মিথ্যার সরল বিতর্কে না গিয়ে প্রশ্নটা অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলাম—একজন শ্রমিকের কাছ থেকে যে শ্রম নেওয়া হয়েছে, তার হিসাব কোথায়?

কর্তৃপক্ষ স্বপনের অনুপস্থিতির হিসাব করেছিল।

আমরা তাদের নিজেদের হিসাবের খাতায় তার অতিরিক্ত শ্রমের হিসাব দেখতে চেয়েছিলাম।

জানি না, কর্তৃপক্ষ তখন ঠিক কী ভেবেছিল। হয়তো তারা বুঝেছিল, বিষয়টি সামনে এগোলে প্রশ্ন শুধু স্বপনের অনুপস্থিতি নিয়েই থাকবে না; বরং প্রতিষ্ঠানের কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ, অতিরিক্ত শ্রমের পারিশ্রমিক—এসব প্রশ্নও সামনে চলে আসবে।

তাই তারা আর এগোয়নি।

সেদিন স্বপনের চাকরিটা বেঁচে গিয়েছিল।

আর আমার ট্রেড ইউনিয়ন জীবনের শুরুতেই আমি আরেকটি বিষয় শিখেছিলাম—

শ্রমিকের পক্ষে দাঁড়ানো মানে সবসময় তার অভিযোগ অস্বীকার করা নয়। কখনো কখনো সত্য ঘটনাটিকেই অন্য এক সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে হয়।

সেদিন স্বপন তার অনুপস্থিতির হিসাব নিয়ে এসেছিল।

আমি তার সঙ্গে বসে হিসাব করেছিলাম—সে আসলে কতটা সময় তার জীবন থেকে কারখানাকে দিয়ে এসেছে।

সেই হিসাবটাই শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে বড় জবাব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এই গল্পটি হয়তো খুব বড় কোনো ঘটনা নয়।

কিন্তু আমার কাছে এটি সেইসব গল্পের একটি, যেগুলো লিখে রাখা হয়নি—শুধু মনে থেকে গেছে।

আর সেই স্মৃতির ভাঁজ খুললেই মনে হয়, ট্রেড ইউনিয়ন শুধু দাবি-দাওয়া, মিছিল-মিটিং কিংবা স্লোগানের নাম নয়।

কখনো কখনো একটি কাগজের জবাবও একজন শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানোর একটি ছোট্ট লড়াই হতে পারে।

চলবে . . .