একটি হারানো কবিতার জন্য দীর্ঘশ্বাস — শোয়েব নাঈম

কবি শাহিদ আনোয়ারের এই সেই কবিতা, যার মোহে একদিন এক জাহাজভর্তি আবেগে আমি পাড়ি দিয়েছিলাম অজানা সমুদ্রের পথে—
যখন হলো না প্রেম
তোমার আমার প্রেম
তখন না-হোক প্রেম।
তখন একটু দেই
চলনা একটু দেই,
আরও একটু দেই
নিদেন পক্ষে দেই
শুক্লো পক্ষে দেই
প্রেমের মহড়া…..

প্রতিটি লাইন কাব্যভাষায় একই অ্যালাইনমেন্টে বাম পাশে সাজিয়ে, লিরিক্যাল ব্যালেন্সে নয়টি পঙ্‌ক্তি দিয়ে এক একটি স্তবক তৈরি করে, এরকম পাঁচটি স্তবকের সম্প্রসারণে— সুস্পষ্ট, সাহসী, ছকভাঙা উক্তি সম্পুর্ণ করে এই কবিতাটি সৃজন করেছিলেন কবিতার নায়ক শাহিদ আনোয়ার। তিনি অসম্ভব আর বেমানান সব প্রেমের অনুষঙ্গ জড়িয়ে এই কবিতাকে অলংকৃত করেছিলেন। এমন সব অসম্ভব, বেমানান ইলিউশনে প্রেমের কাছে আত্মসমর্পণ করে এই কবিতা সৃজন করেছিলেন সম্ভবত ১৯৮৭ সালে। কবি শাহিদ আনোয়ারের অপূর্ব রোমান্টিক অস্তিত্ব সেই সময়ে তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল অনুভূতির এক গভীর সমুদ্রে! কবিতার নায়ক শাহিদ আনোয়ার সেই আশির দশক থেকেই ক্ষুরধার সব কবিতা সৃজন করে চলেছেন। কবিতার ঘোরে তখন তিনি প্রতিটি পাখির ডাক থেকেও সম্ভবত আলাদা অর্থ বের করে ফেলতে পারতেন। ১৯৮৭ সালে অক্টোবরের এক শুক্রবার সকালে ফুলকির অচিরা পাঠচক্রে কবিতার নায়ক শাহিদ আনোয়ার সেদিন নিউজপ্রিন্ট পেপারে লেখা ‘যখন হলো না প্রেম’ কবিতাটি— তাঁর গভীর, গাঢ় আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতির এক গভীরতর মাত্রায় পাঠ করে করে যখন এই কবিতার সমাপ্তি টানেন তখন আমি ধানক্ষেতের মতো নড়েচড়ে বসেছিলাম। তখন কবিতা কী— এর যথার্থ বোধ আমার কাছে পরিষ্কার না হলেও, এই কবিতায় কবির রোমান্টিক আত্মনিবেদনের উত্তাল তরঙ্গে আমি তখন নড়েচড়ে উঠেছিলাম। কিন্তু সেদিন পাঠচক্রে কবি শাহিদ আনোয়ারের এই কবিতা পাঠের পর, উপস্থিত বিভিন্নজনের প্রতিক্রিয়াধর্মী আলোচনায় এই কবিতা সহানুভূতির আয়ু না পাওয়াতে, কবি নিঃসঙ্গতার অনুপ্রাসে নিউজপ্রিন্ট পেপারে লেখা এই কবিতাটি ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটে রেখে দিলেন। সেদিন আলোচকদের দীর্ঘ পর্যালোচনার সারমর্মে যে কথাটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, তা হলো— এই কবিতার প্রথম ও শেষ পরিচয় একটিই, তা হচ্ছে এই কবিতা মূলত এক অভিনব স্টান্টবাজি নির্ভর সৃজন, যেখানে কাব্যিক গভীরতার চেয়ে চমক, কারুকার্যের চেয়ে কৌশল এবং অনুভবের চেয়ে প্রদর্শনই মুখ্য হয়ে উঠেছে। সেদিন কবিতা বিশ্লেষণের হাতিয়ারে এই স্বরচিত কবিতা অগ্রহণীয় হয়ে উঠলেও, এমন কবিতার ভেতরে এমন এক দহন আছে, যা নিভে যাওয়া রোমান্টিক বোধকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার এক অনুঘটক শক্তি আছে। আজ মনে হয়— কবির কোনো বন্ধু হয় না, যেমন রাজার কোনো বন্ধু থাকে না। আমার ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বোধ থেকে ঐ ভাঁজ করা কবিতাটি শাহিদ ভাইয়ের কাছ থেকে সেদিন চেয়ে নিয়েছিলাম। ঘোর লাগা এক বোধ থেকে, রোমান্টিক এই কবিতাটি আবৃত্তির উদ্দেশ্যে এক সময় পুরোই আমি মুখস্ত করেছিলাম। এখন আর এই দীর্ঘ কবিতাটি গোটা মুখস্ত নাই, সেই কবিতাটি তাঁর প্রকাশিত কোনো গ্রন্থেও সংযুক্ত হতে দেখি নাই। সম্ভবত শাহিদ ভাই ‘যখন হলো না প্রেম’ কবিতার আলাদা কোনো কপি না রেখেই সেদিন মূল লেখাটি আমাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। আর আমিও হারিয়ে ফেলেছি নিউজপ্রিন্টের দুই পাতায় লেখা এই কবিতা।

কিছু কিছু কবিতা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত না হয়েও পরবর্তীকালে সাহিত্যের ইতিহাসে হয়ে ওঠে এক অনন্য প্রাপ্তির পরিচয়। আমি নিশ্চিত কবিতার নায়ক শাহিদ আনোয়ারের ‘যখন হলো না প্রেম’ কবিতাটি হারিয়ে না গেলে, একদিন পার্থিব বাসনায় প্রিয়ার আঁচলের হাওয়ায় এর কবিত্ব থেকে এর অমরত্ব ঠিকই গুমরিয়ে উঠত। কথায় কথায় অনেক দূর চলে এসেছি আসল কথাটা না বলে, ২০১৯ সালে এক বেপরোয়া বোধ থেকে ‘যখন হলো না প্রেম’ কবিতাটি আমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করি। ২০১৯ সালে থিয়েটার ইনস্টিটিউটে ‘খড়িমাটি’ আয়োজিত দুইদিন ব্যাপী ‘হেমন্তের কবিতা সন্ধ্যা’ কবিতাপাঠের আসরে কবিতার নায়ক শাহিদ আনোয়ারের সাথে দেখা করতে যাই। আমি যে সেদিন কবিতাপাঠের আসরে উপস্থিত থাকব এই বিষয়টি কবি সেলিনা শেলীকে আগেই অবগত করেছিলাম। কারণ ঐ সময়ে শাহিদ ভাইয়ের কিছু কবিতা নিয়ে আমার পাঠপ্রতিক্রিয়া নির্ভর আলোচনা লিখে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলাম। তাই কবি সেলিনা শেলীকে অনুরোধ করেছিলাম ‘হেমন্তের কবিতা সন্ধ্যা’ কবিতাপাঠের আসরে আসার সময়ে শাহিদ ভাইয়ের প্রকাশিত সকল কাব্যগ্রন্থগুলি যেন সাথে করে নিয়ে আসে। সেলিনা শেলী ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ সালের বিকালে শাহিদ ভাইকে সাথে নিয়ে, যেভাবে শাহিদ ভাইয়ের অসুস্থতা সূচনা করেছিল এই দম্পতির জীবনে কষ্টের সমুদ্র, সেই অন্তহীন কষ্টের অনুভূতিগুলিকে নিভৃত করে, সেলিনা শেলী খুব আন্তরিকভাবেই শাহিদ ভাইয়ের প্রকাশিত সকল কাব্যগ্রন্থ আমার হাতে সেদিন তুলে দিয়েছিলেন। শাহিদ ভাইয়ের সাথে অনেকদিন পর আবার দেখা, কবিতার নায়ক শাহিদ আনোয়ারের সৃজনের সকল ইচ্ছে তখন বিভিন্ন রোগের জটিলতায় ভীষণভাবে আক্রান্ত। শাহিদ ভাইয়ের শরীর ও মনন সৃজনের নিবিড়তা থেকে তখন অনেক দূরে। কবিতার নায়কের সাথে হ্যান্ডশেককালে আমি তাঁর কল্পিত সুস্থতার জন্য, অবাস্তব সুদিনের জন্য প্রার্থনা করেছিলাম। কল্পিত ও অবাস্তবতা ছিল এই কারণেই যে, শাহিদ ভাইয়ের নির্মম নিয়তি তখন ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে, কষ্টের কেন্দ্রস্থলে জীবনের সমুদ্র তখন সমাপ্তি টানছে। শাহিদ ভাই তখন নিজের বিবিধ জটিল রোগের বেদনায় সম্পূর্ণ আলাদা এবং সৃজনশীলতা থেকে একা। শাহিদ ভাই বুর্জোয়া সমাজ পাল্টানোর উদ্দেশ্যে গরিবি সততায় আজীবন আস্থাশীল ছিলেন। দারিদ্রকে তিনি দেখতেন সমবেত মায়ায়, দ্বান্দ্বিক একাত্মতায়, দার্শনিক প্রমায় এবং কবিতার বীক্ষায়।

থিয়েটার ইনস্টিটিউট হলে সেই ডিসেম্বরের শীতসন্ধ্যায় কবিতাপাঠের আসরে শাহিদ ভাইয়ের সাথে আলাপকালে তাঁকে ‘যখন হলো না প্রেম’ এই কবিতার আর কোনো কপি আছে কিনা জানতে চেয়েছিলাম, তাঁর সৃজনশীল সেই নক্ষত্রময় সময় তিনি আর স্মরণ করতে পারছিলেন না। বিষাদের প্রত্যাবর্তনের মতো করে তিনি জানিয়ে দিলেন এই কবিতা তিনি কখনো সৃজন করেছেন কিনা তা তাঁর মনে নেই! তখন কবির বিস্মরণের পেরেক পুঁতে দিল আমার পুনরুদ্ধারের সকল ইচ্ছার ওপর। অথচ পঁয়তাল্লিশ লাইনের এই কবিতা আমি মুখস্থ আবৃত্তি করেছিলাম ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে, কলেজ ছাত্রসংসদ আয়োজিত পহেলা বৈশাখ প্রভাতের অনুষ্ঠানে একজন অতিথি আবৃত্তিকার হিসাবে, আবৃত্তি করেছিলাম কোনো ঘাবড়ে না গিয়ে। এর আগে এই কবিতা ‘স্বরশ্রুতি’র কার্যালয়ে একক আবৃত্তি করেছিলাম কয়েকবার। এই কবিতার শেষ লাইন পর্যন্ত উপচে পড়া রোমান্টিক শিহরণ আছে, যা শ্রোতাকেও উম্মাতাল করে রাখত। তাই মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে এই কবিতার আবৃত্তি শেষ হলে সম্মুখে বসে থাকা কবি মোশতাক আহমদকে দেখি, তিনি মিটিমিটি করে হাসছেন। তখন মোশতাক আহমদ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র, সম্ভবত তাঁর ‘সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট’ কাব্যগ্রন্থের পান্ডুলিপি তখন তৈরি হচ্ছিল। কবি শাহিদ আনোয়ারের মেধার ধার এত ধুরন্ধর ছিল বলেই এমন একটি বেপরোয়া সুপারহিট কবিতা সৃজন করা সম্ভব হয়েছিল। অথচ সুপারহিট কবিতার কোনো কপি আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না, সবার আড়ালে চিরতরে হারিয়ে গেল! ফুলকির অচিরা পাঠচক্রে কবি শাহিদ আনোয়ার শেষবারের মতো ‘যখন হলো না প্রেম’ কবিতাটি পাঠ করছিলেন, তখন তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি অনুভব করছিলাম, তিনি এক স্তবক শেষ করে আরেক স্তবকের পাঠ যখন শুরু করছিলেন, তখন তিনি প্রতিবার নতুন স্বর্ণমুদ্রার মতো ঝলসে উঠছিলেন। সেদিন সেই পাঠচক্রে উপস্থিত ছিলেন— কবি ও শিশুসাহিত্যিক ওমর কায়সার, কবি ও কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী, কবি মুনির আহমদ, কবি ও অনুবাদক জ্যোতির্ময় নন্দী, কবি ও সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, ছড়াকার ও কলাম লেখক অজয় দাশগুপ্ত, কবি ও গল্পকার প্রলয় দেব, কবি ও সাংবাদিক ইব্রাহিম আজাদ, চট্টগ্রাম ফিল্ম সোসাইটির হাসান ইমাম, কবি সুবীর কর, বিকাশ এবং আমি। হাসান, সুবীর, বিকাশ এবং আমি ছাড়া উপস্থিত অন্য সকলেই এই কবিতা নিয়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া মৌখিকভাবে তুলে ধরেছিলেন, আর আমরা শুধু গভীর মগ্নতায় তাদের আলাপ শুনছিলাম। তখন ফুলকি প্রাঙ্গণের ভিতরে হাঁটলে শুধু শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিস্ময়কর সব কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করা যেত। ফুলকির এরকম চর্চার প্রাচুর্য আর সমৃদ্ধির সময়ে কবি শাহিদ আনোয়ারের স্মৃতিভারাতুর ‘যখন হলো না প্রেম’ কবিতাটি চিরতরে হারিয়ে গেল!