যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–২ -ফজলুল কবির মিন্টু

জীবনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যৌন হয়রানীর

জীবনের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না।

সে আমাদের সংগঠনের কর্মীও ছিল না। আমার সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল না। তারপরও একসময় তার জীবনের একটি কঠিন অধ্যায়ের সঙ্গে আমার নাম জড়িয়ে গেল। সেই গল্পটা আজও মাঝে মাঝে মনে পড়ে।

একদিন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের একজন ব্যবস্থাপকের সঙ্গে দেখা। কথায় কথায় তিনি আমাকে জানালেন, তাদের একজন শ্রমিক—জীবনের বিরুদ্ধে একজন নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিষয়টি স্পর্শকাতর ছিল।

আমি তাকে তখনই বলেছিলাম,“অভিযোগটি যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে জীবনকে কোনো সহযোগিতা করা হবে না।”

আমার অবস্থান ছিল পরিষ্কার। অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রশ্নই আসে না। বিশেষ করে যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগে তো নয়ই।

কয়েকদিন পর জীবনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলো।

জীবন আমাদের সংগঠনের হানিফের কাছ থেকে কোনোভাবে আমার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে আমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল। ফোন পাওয়ার পরপরই আমি তাকে জানিয়ে দিলাম—তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে আমি আগে থেকেই অবহিত। তাই আমাদের পক্ষ থেকে তাকে কোনো সহযোগিতা করা সম্ভব নয়।

জীবন তখন অদ্ভুত একটি কথা বলল।

“আপনার সঙ্গে একবার দেখা করে আমার কথাটা বলতে দেন। এরপর আপনি যদি আমাকে সহযোগিতা না করেন, তাতেও আমার কোনো আপত্তি থাকবে না।”

কথাটা আমার মনে দাগ কাটল।

আমি তার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হলাম।

জীবন এসে তার কথাগুলো বলল।

তার বক্তব্য শুনতে শুনতে একসময় আমি থমকে গেলাম।

যে নারীকে কেন্দ্র করে জীবনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই নারী প্রায় তিন বছর আগেই চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। আরও আশ্চর্যের বিষয়—তার পক্ষ থেকে জীবনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও করা হয়নি। অর্থাৎ অভিযোগটি ওই নারীর করা নয়; প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ নিজেদের উদ্যোগেই জীবনের বিরুদ্ধে অভিযোগটি তুলেছে।

সেদিন আমার কাছে বিষয়টি অন্যরকম হয়ে উঠল।

অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—সেটা তদন্তের বিষয়। কিন্তু যে নারী প্রায় তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন, তার নামে এতদিন পর একজন শ্রমিকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে—এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, সেই প্রশ্নটা আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

আমার সন্দেহ হলো, কারণ দর্শানোর নোটিশটির উদ্দেশ্য হয়তো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা নয়; বরং জীবনকে সরিয়ে দেওয়ার একটা পথ তৈরি করা।

আমি সিদ্ধান্ত বদলালাম।

জীবনকে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

তার কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব আমি লিখে দিলাম। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করলাম—যে নারীকে যৌন হয়রানির অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু করা হয়েছে, তিনি প্রায় তিন বছর আগেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন এবং তার পক্ষ থেকে জীবনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।

আমি আরও লিখলাম, এ অবস্থায় অভিযোগটি ভিত্তিহীন, কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়।

আমরা বিষয়টিতে সাংগঠনিকভাবে মাথা ঘামাচ্ছি—এ খবর কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতেই তারা নড়েচড়ে বসল।

তদন্ত কমিটি হলো।

সেই তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি ছিলেন আমাদের সংগঠনের আরেক কর্মী সাত্তার। সে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভূমিকা রেখেছিল। তদন্তের সময় বিষয়গুলো সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত জীবনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হলো।

কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হলো না।

অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি—কিন্তু কর্তৃপক্ষ জীবনকে আর কারখানায় রাখতে চাইল না।

তখন নতুন সিদ্ধান্ত হলো—শ্রম আইনের ২৬ ধারার অধীনে জীবনকে টার্মিনেশন করা হবে এবং তার আইনগত পাওনাদি পরিশোধ করা হবে।

জীবন চাকরি হারাল।

তবে এক অর্থে সেদিন সে একটা লড়াই জিতেছিল।

কারণ আমাদের দেশে অনেক শ্রমিককে টার্মিনেশনও ঠিকমতো করা হয় না। কখনো মৌখিকভাবে বলে দেওয়া হয়, “কাল থেকে আর আসার দরকার নেই।” কখনো নানা চাপ দিয়ে রিজাইন লিখিয়ে নেওয়া হয়। আর তখন শ্রমিকটি হারায় তার ন্যায্য পাওনাদি পাওয়ার সুযোগ।

জীবনের ক্ষেত্রে অন্তত সেটা হতে দেওয়া হয়নি।

অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তাকে চাকরি থেকে সরানো হলেও শ্রম আইনের বিধান অনুসরণ করে পাওনাদি পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

এটাই ছিল আমাদের আপাতত সাফল্য।

কিন্তু আমরা তখনও জানতাম না, এই সাফল্যের মূল্য জীবনকে আরও অনেক বছর ধরে দিতে হবে।

পরবর্তীতে জীবন আমাদের সংগঠনের কর্মী হিসেবে যোগ দিল।

প্রশিক্ষণ নিল। শ্রম আইন শিখল। সংগঠন করার কৌশল শিখল। ধীরে ধীরে সে একজন দক্ষ সংগঠকে পরিণত হলো।

তারপর আরেকটি পোশাক কারখানায় চাকরি নিল।

সেখানে সে একটি ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত—এই পরিচয়টিও একসময় কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকাশ হয়ে গেল।

তারপর শুরু হলো আরেক অধ্যায়।

নানা ধরনের ষড়যন্ত্র।

নানা রকম চাপ।

নানা অভিযোগ।

একজন শ্রমিক যখন নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলে, তখন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তৈরি করা খুব কঠিন নয়। কর্মক্ষেত্রে তাকে একঘরে করা, তার কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ছোটখাটো বিষয়কে বড় করে তোলা—এসব যেন পুরোনো কৌশল।

আমরা তখনও জীবনের পাশে ছিলাম।

ষড়যন্ত্রের জবাব দিয়েছি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি। আইনগত ও সাংগঠনিকভাবে মোকাবিলা করেছি।

শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠানও জীবনকে শ্রম আইনের ২৬ ধারার অধীনে টার্মিনেশন করল।

আবার চাকরি গেল।

কাগজে-কলমে হয়তো সবকিছু আইন মেনেই হলো।

কিন্তু জীবনের জীবনে আইন মেনে টার্মিনেশনের আড়ালে যে অদৃশ্য দরজা বন্ধ হয়ে গেল, তার হিসাব কোনো কাগজে লেখা থাকল না।

জীবন ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে গেল।

এরপর আর কোনো পোশাক কারখানায় তার চাকরি হলো না।

একজন শ্রমিকের বিরুদ্ধে অন্যায় হলে তার পাশে দাঁড়ানো—কাগজে-কলমে এটা হয়তো খুব ছোট একটি কাজ। কিন্তু বাস্তবে তার মূল্য অনেক বড় হতে পারে।

জীবনের জীবনটাই তার প্রমাণ।

সে ট্রেড ইউনিয়ন করেছে। শ্রমিকের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। আর সেই কারণে একসময় তার জন্য পোশাকশিল্পের দরজাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেছে।

আজ জীবন অর্থকষ্টে দিন কাটায়।

পেশা বদলে সিএনজি চালানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেখানেও জীবন খুব একটা স্বস্তি পায়নি। কিছুদিন আগে শুনলাম, সে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছে।

খবরটি শুনে অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল।

ভাবলাম, একজন শ্রমিকের জন্য আমরা কী করতে পেরেছিলাম?

হ্যাঁ, আমরা তার বিরুদ্ধে আনা একটি অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমরা তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ করে দিয়েছিলাম। তদন্তে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলাম, চাকরি হারালেও যেন তার আইনগত পাওনাগুলো থেকে তাকে বঞ্চিত করা না হয়।

কিন্তু তারপর?

তার জীবনের যে দীর্ঘ অন্ধকার শুরু হলো, তার শেষ কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।

শুধু এটুকু জানি—শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কথা বলা অনেক সময় শুধু একটি চাকরি বাঁচানোর লড়াই নয়। কখনো কখনো সেই লড়াইয়ের মূল্য দিতে হয় চাকরি দিয়ে, জীবিকার নিরাপত্তা দিয়ে, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দিয়ে।

আর সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—আইন মেনে কাউকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া গেলেও, তার পেছনে যদি থাকে ট্রেড ইউনিয়ন করার অপরাধ, অধিকার নিয়ে কথা বলার অপরাধ, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অপরাধ—তাহলে সেই টার্মিনেশনের ক্ষত কাগজে দেখা যায় না।

জীবনের গল্পে তাই শুধু একটি শ্রমিকের চাকরি হারানোর গল্প নেই।

আছে একজন শ্রমিকের সাহসের গল্প।

আছে সংগঠনের পাশে দাঁড়ানোর গল্প।

আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মূল্য দেওয়ার গল্প।

আর আছে আমাদের সমাজের সেই নির্মম বাস্তবতা—যেখানে একজন শ্রমিক তার অধিকার চাইতে গিয়ে কখনো কখনো নিজের ভবিষ্যৎটাকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।

জীবন হয়তো আজ সিএনজি চালায়। হয়তো শরীরও আগের মতো নেই। হয়তো অর্থকষ্টে দিন কাটে।

কিন্তু আমার মনে হয়, জীবনের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার চাকরির পদবি নয়।

সে একদিন ভয়কে অতিক্রম করে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সেই দাঁড়িয়ে থাকার গল্পটাই হয়তো একদিন লেখা হবে।

এই গল্পটি সেই না-লেখা গল্পগুলোরই একটি।