আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই -ফজলুল কবির মিন্টু
২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রণীত হয় জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮। জাহাজভাঙা শিল্পকে একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও দক্ষতাভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা এবং এই খাতে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইনটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু আইন প্রণয়নের প্রায় সাড়ে আট বছর পেরিয়ে গেলেও এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
বিশেষ করে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের ডাটাবেজ এবং বাধ্যতামূলক জীবনবীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন কোথায়?
প্রশিক্ষণের বিধান কাগজেই
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮-এর ১৯ ধারায় শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ধারাটির উপধারা (১)-এ বলা হয়েছে, বোর্ড কর্ম শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে বিধিতে নির্ধারিত পদ্ধতিতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে।
অর্থাৎ জাহাজভাঙা শ্রমিককে তার দায়িত্ব ও কাজের ধরন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত করার দায়িত্ব আইনে নির্ধারিত হয়েছে। এটি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং নিরাপদ ও দক্ষ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য একটি আইনি কাঠামোর অংশ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই ধারার উপধারা (২)-এ বলা হয়েছে, শ্রমিক-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার আইন কার্যকর হওয়ার অনধিক পাঁচ বছরের মধ্যে একটি Training Institute প্রতিষ্ঠা করবে।
আইনটি কার্যকর হওয়ার পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। অথচ আজও প্রশ্ন রয়ে গেছে—সেই প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট কোথায়? কবে এটি প্রতিষ্ঠিত হবে? এর অবকাঠামো, জনবল ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কোনো দৃশ্যমান রোডম্যাপ আছে কি?
আইনের সময়সীমা যেখানে পাঁচ বছর, সেখানে প্রায় সাড়ে আট বছর পরও যদি প্রশিক্ষণ কাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে দৃশ্যমান না হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার?
প্রশিক্ষিত শ্রমিকের ডাটাবেজও নেই
১৯(৩) ধারায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বোর্ড প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি হালনাগাদ ডাটাবেজ সংরক্ষণ করবে এবং ইয়ার্ড মালিকরা ওই ডাটাবেজভুক্ত শ্রমিকদের মধ্য থেকে শ্রমিক নিয়োগ করবে।
এই বিধানের গুরুত্ব অনেক।
কারণ জাহাজভাঙা শিল্পে একজন শ্রমিক কোন কাজের জন্য প্রশিক্ষিত, তার দক্ষতার স্তর কী, কোন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার সক্ষমতা তার রয়েছে—এসব তথ্য জানা থাকলে শ্রমিকের দক্ষতা অনুযায়ী কাজ দেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে অদক্ষ শ্রমিককে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগের প্রবণতাও কমানো সম্ভব।
কিন্তু প্রশিক্ষণই যদি পর্যাপ্তভাবে না হয়, তাহলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের হালনাগাদ ডাটাবেজ তৈরি হবে কীভাবে?
ফলে আইনের ১৯(১), ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারা যেন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত একটি চক্র। প্রশিক্ষণ → প্রশিক্ষিত শ্রমিক → ডাটাবেজ → দক্ষতা অনুযায়ী নিয়োগ। এই পুরো ব্যবস্থাটিই যদি কার্যকর না হয়, তাহলে আইনের উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থেকে যায়।
শ্রমিকের জীবনবীমা কোথায়?
শুধু প্রশিক্ষণ নয়, শ্রমিকের জীবন সুরক্ষার ক্ষেত্রেও আইনটি স্পষ্ট।
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮-এর ২০(১) ধারায় বলা হয়েছে, ইয়ার্ড মালিকগণ ইয়ার্ডে কর্মরত সকল শ্রমিক-কর্মচারীর নামে আবশ্যিকভাবে জীবনবীমা করবেন।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। কারণ জাহাজভাঙা শিল্প বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প হিসেবে পরিচিত। বিষাক্ত গ্যাস, আগুন, বিস্ফোরণ, ভারী ধাতু ও স্টিলের আঘাত, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া, ক্রেন ও ভারী যন্ত্রপাতির দুর্ঘটনা—বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মধ্যে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়।
এমন একটি শিল্পে কর্মরত প্রতিটি শ্রমিকের জীবনবীমা থাকা শ্রমিকের পরিবারের জন্য একটি মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, জাহাজভাঙা শ্রমিকদের জন্য এই বাধ্যতামূলক জীবনবীমা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে আজও বড় প্রশ্ন রয়েছে।
আইনে ‘আবশ্যিকভাবে’ জীবনবীমার কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রতিটি শ্রমিকের নামে কার্যকর বীমা করা হয়েছে কি না, তার স্বচ্ছ তথ্য শ্রমিকদের সামনে নেই। থাকলে সেই তথ্যই বা কোথায়?
দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের বিধানও রয়েছে
আইনের ২০(২) ধারায় বলা হয়েছে, ইয়ার্ডে দুর্ঘটনার কারণে কোনো শ্রমিক-কর্মচারী মৃত্যুবরণ করলে বা গুরুতর আহত হলে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে শ্রমিকের কর্মদক্ষতা ও কর্ম শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে বাংলাদেশ শ্রম আইনে উল্লিখিত ক্ষতিপূরণের অতিরিক্ত হিসেবে তার পরিবারকে বা তাকে ইয়ার্ড মালিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে পারবেন।
এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, শ্রমিকের মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণের একটি অতিরিক্ত কাঠামোর কথা আইন স্বীকার করেছে।
দ্বিতীয়ত, ক্ষতিপূরণের সঙ্গে শ্রমিকের কর্মদক্ষতা ও কর্ম শ্রেণিবিন্যাসের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে কোনো দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে এই আইনের ২০(২) ধারা কতটা প্রয়োগ করা হচ্ছে, তারও একটি স্বচ্ছ হিসাব প্রয়োজন।
শ্রমিক মারা যাওয়ার পর পরিবারকে এককালীন কিছু টাকা দিয়ে দায় শেষ করা আর আইনে নির্ধারিত অধিকার নিশ্চিত করা—দুটি এক বিষয় নয়।
EIS-এর উদ্যোগও কি লাল ফিতায়?
জাহাজভাঙা শ্রমিকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নে Employment Injury Scheme (EIS) নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আইএলও ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সহযোগিতায় জাহাজভাঙা খাতে এমন একটি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
এই ধরনের কর্মক্ষেত্রভিত্তিক দুর্ঘটনা ও কর্মজনিত আঘাতের জন্য একটি কার্যকর Employment Injury Scheme চালু হলে শ্রমিক ও তার পরিবার দুর্ঘটনা, স্থায়ী অক্ষমতা কিংবা মৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় আসতে পারে।
কিন্তু উদ্যোগ, আলোচনা, প্রকল্প বা পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন এক জিনিস নয়।
শ্রমিকের প্রশ্ন খুব সরল—কবে থেকে এই ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর হবে?
কতজন শ্রমিক এর আওতায় আসবেন? কারা অর্থ প্রদান করবেন? দুর্ঘটনার পর কত দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে? স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে কী সুবিধা থাকবে? শ্রমিকের পরিবার কীভাবে সুবিধা পাবে? এসব বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট, প্রকাশ্য ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রয়োজন।
আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮ প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এই শিল্পকে একটি নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা। কিন্তু আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়।
একদিকে বলা হচ্ছে শ্রমিককে প্রশিক্ষিত করা হবে, অন্যদিকে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নেই। বলা হচ্ছে প্রশিক্ষিত শ্রমিকদের ডাটাবেজ থাকবে, কিন্তু সেই ডাটাবেজের কার্যকর অস্তিত্ব দৃশ্যমান নয়। বলা হয়েছে সব শ্রমিকের নামে বাধ্যতামূলক জীবনবীমা করতে হবে, কিন্তু সেই বীমা বাস্তবে কতজন শ্রমিক পেয়েছেন তার স্বচ্ছ হিসাব নেই। আবার কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ কতটা হচ্ছে, সেটিও প্রশ্নের মুখে।
এভাবে আইনের ধারা যদি বছরের পর বছর কাগজে পড়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—আইনটি কি শ্রমিকের সুরক্ষার জন্য, নাকি শুধু আইন বইয়ের পৃষ্ঠা পূরণের জন্য?
এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের সময়সীমা
জাহাজভাঙা শিল্পে প্রতিদিন শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন শ্রমিকের জীবন কেড়ে নেয় না; একটি পরিবারের উপার্জনের একমাত্র পথও বন্ধ করে দিতে পারে।
তাই এখন আর শুধু নতুন আইন, নতুন কমিটি কিংবা নতুন প্রকল্পের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিদ্যমান আইনের বাস্তবায়ন।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত—
১. জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮-এর ১৯ ধারার পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা;
২. আইন অনুযায়ী Training Institute দ্রুত প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর করা;
৩. কর্ম শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা;
৪. প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের জাতীয় পর্যায়ে হালনাগাদ ডাটাবেজ তৈরি ও জনসমক্ষে এর কাঠামো প্রকাশ করা;
৫. ২০(১) ধারা অনুযায়ী প্রতিটি শ্রমিকের নামে বাধ্যতামূলক জীবনবীমা বাস্তবে নিশ্চিত করা এবং এর তদারকি জোরদার করা;
৬. দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহত শ্রমিকদের জন্য ২০(২) ধারার অধীনে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
৭. জাহাজভাঙা খাতে Employment Injury Scheme বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমা ও রোডম্যাপ ঘোষণা করা;
৮. এসব ব্যবস্থার বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সাধারণ—আইন যখন শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করেছে, তখন সেই অধিকার বাস্তবায়নে এত দীর্ঘ অপেক্ষা কেন?
২০১৮ সালের আইন ২০২৬ সালে এসে যদি এখনও প্রশিক্ষণ, ডাটাবেজ ও জীবনবীমার মতো মৌলিক বিষয় বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকে, তাহলে শুধু নতুন আইন করার মধ্যে কোনো সাফল্য নেই। সাফল্য তখনই, যখন একজন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার আগে জানবেন—তিনি প্রশিক্ষিত, তার দক্ষতার স্বীকৃতি আছে, তার নামে বীমা আছে এবং দুর্ঘটনা ঘটলে তার পরিবার রাষ্ট্র ও আইনের সুরক্ষা পাবে।
শ্রমিকের নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি আইনি অধিকার। আর আইনি অধিকার বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
(লেখকঃ জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্য কেন্দ্র, বিলস-ডিটিডিএ প্রকল্প)