মতামত

বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণি সুবর্ণ জয়ন্তীতে কেমন দিন কাটাচ্ছেন?

-অধ্যাপক এম এম আকাশ

অধ্যাপক এম এম আকাশ (ফাইল ছবি)

তৃতীয় পর্বঃ করোনা পরবর্তী শক  (Shock)

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ১৯৭৩ সালের পর থেকে ও পর্যন্ত জিডিপি বা মোট আভ্যন্তরীণ আয়ের অনেক প্রবৃদ্ধি দেখেছি। প্রথম পর্বে বঙ্গবন্ধুর শসনামলে ক্ষুদ্র ভিত্তির কারণে জি ডি পি – বেশ উঁচু ৬ শতাংশ হারে বেড়েছিল। ১৯৭৫-৯০ এই দ্ধিতীয় পর্বে তা কিছুটা কমে তিন বা চার শতাংশ হারে বেড়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯০-এর পর তা ক্রমাগত ত্বরান্বিত হয়েছে। ৬-৭-৮ শতাংশ হারেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশ্বব্যাপি করোনাকালে আবার তা ৩ শতাংশ হারে নেমে এসেছিল। এখন আবার ৫ শতাংশ-৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও প্রবৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে, কিন্তু তারপরেও সাধারণ ভাবে আমাদের প্রবৃদ্ধি ও গড় আয় যে ক্রমাগত বেড়েছে এ নিয়ে বিশ্বে কোনো সন্দেহ নেই। এই প্রবৃদ্ধির কিছুটা সুলভ চুঁইয়ে পরে দরিদ্রদের কাছে পৌছায় বলে দারিদ্যের হারও এই সময় কমেছে। ১৯৭৩ সালে দারিদ্র্যের হার ৮২ থেকে হাস পেয়ে ১৯৯১ সালে ৪১ শতাংশে এবং ২০১৬ সালে ২৪ শতাংশে উপনীত হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে সংখ্যার হিসাবে ১৯৭৩ সালে দরিদ্র লোক ছিলেন প্রায় সবাই অর্থাৎ ৭ কোটির মধ্যে প্রায় ৬ কোটি লোকই ছিলেন দরিদ্র। কিন্তু করোনা পূর্ববর্তী সময়ে ১৮ কোটি লোকের মধ্যে দরিদ্র লোকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ কোটি। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে তখন অত না খাওয়া-না-পাওয়া লোক দেশে ছিল না। দারিদ্র্যের হার এই সূচক-এ আমাদের বেশ উন্নতি হয়েছে বলা যায় এবং এই Narrative বা গল্পটাই আমরা শাসকশ্রেণির মুখে শুনি। কিন্তু বৈষম্য,  সুশাসনের অভাব ও শ্রমিকশ্রেণির শোষণ বঞ্চনার আখ্যাগুলো কমই শোনা যায়।

কিন্তু যখন আমরা অধিকাংশ গরিব-নিস্নবিত্ত মধ্যবিত্তরা অল্প সংখ্যক টাকাওয়ালা লোকদের দিকে তাকাই তখন সত্যই আওমাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আমরা শুনি একটি পোশাক শিল্পের অপারেটরের আয় সারা দিন পরিশ্রম করে হয় সর্বোচ্চ তিন শত টাকা অথচ একজন দশ কোটি টাকার বিনিয়গকারীর শুধু মাত্র সর্বনিস্ন ২০ শতাংশ মুনাফার পরিমাণই হচ্ছে বৎসরে ২ কোটি টাকা দিনেতার আয় হয় ৫৪ হাজার টাকা যা কিনা ঐ অপারেটরের তুলণায় ১৮০ গুণ বেশি। অর্থাৎ একজন সাধারণ অপারেটর দেখছেন যে ১৮০ দিনে বা ৬ মাসে তিনি যা রোজগার করেন তার মালিক সেই একই সমান আয় করেন মাত্র এক দিনে। তখন তার মনে ক্ষোভ ও হতাসার সৃষ্টি হয়। উভয়ে দৈনিক শ্রমের প্রকৃতি যদি আমরা বিচার করি তাহলে আমরে নিশ্চয়ই স্বীকার করবো যে, মালিকরা অনেক দক্ষ এবং কাজও করেন অনেকক্ষন, ঝুঁকিও নেন বেশি কিন্তু তারপরেও এই ১৮০ গুণ অয়ের পার্থক্য কি ন্যায়সংগত বলা যাবে? বঙ্গবন্ধুর প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রীয় আমলাদের মূল সর্বোচ্চ আয় ও সর্ব নিস্নের মধ্যে আদর্শ অনুপাদ হিসাবে যেটি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন তার পরিমাণ হলো ১:৫ । মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে সেটাকে আমরা ১৮০:১ এ পরিণত করেছি। সুতরাং সুদীর্ঘ দ্ধিতীয়  ও তৃতীয় পর্বের শ্রমিকরা দেখেছেন যে তাদের দারিদ্র্যের অবস্থার কিছুটা শস্বুক গতিতে উন্নতি হলেও তারা ক্রমবর্ধ্মান বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। দেখুন আবুল বারাকাত, (২০২০), পৃঃ ৫৭ , পরিশি-১]

পড়ুন:  বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণি সুবর্ণ জয়ন্তীতে কেমন দিন কাটাচ্ছেন?

-অধ্যাপক এম এম আকাশ

চলবে  . . .

লেখকঃ রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনীতি বিভাগ