সিআরবি ও এনসিটি ইস্যু সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা -ফজলুল কবিরমিন্টু

চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল স্থাপন এবং নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিকট ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব এখন আর কেবল উন্নয়ন প্রকল্পের একটি সাধারণ বিষয় নয়—এটি পরিণত হয়েছে জনস্বার্থ, পরিবেশ, ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। এই দুই ইস্যুকে ঘিরে জনমনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা মূলত সরকারের অবস্থানের অস্পষ্টতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থার প্রতিফলন।
সম্প্রতি নৌ পরিবহনমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সিআরবি এবং এনসিটি ইস্যুতে স্পষ্ট বক্তব্য না দিয়ে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নানা মন্তব্য করে জনমনে ধোঁয়াশা ও সন্দেহ সৃষ্টি করেছেন। তার এই বক্তব্য জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ জনগণ এখন আর কৌশলী বা অস্পষ্ট ভাষা নয়, বরং সরাসরি ও জবাবদিহিমূলক অবস্থান দেখতে চায়।
সিআরবি চট্টগ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা, যা শহরের সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের যুক্তি সামনে আনে, তবে প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়ন কি পরিবেশ ও ঐতিহ্য ধ্বংসের বিনিময়ে হওয়া উচিত? অনেকের মতে, বিকল্প স্থান থাকা সত্ত্বেও সিআরবির মতো একটি সংরক্ষিত এলাকায় এ ধরনের স্থাপনা গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে, এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিকট ইজারা দেওয়ার বিষয়টি দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এটি কি দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, নাকি দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি পদক্ষেপ?
এই প্রেক্ষাপটে ইতিহাস আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রবল জনচাপের মুখে বিগত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। একইভাবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এনসিটি ইজারা প্রদানের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছিল। এই উদাহরণগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—জনমতকে উপেক্ষা করে নেওয়া সিদ্ধান্ত টেকসই হয় না।
সুতরাং, বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার যদি প্রবল জনমতকে অগ্রাহ্য করে সিআরবি ও এনসিটি ইস্যুতে একতরফা ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে। আমাদের অতীত বারবার দেখিয়েছে—জনস্বার্থের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সংশোধন করতেই হয়। তবুও একটি তিক্ত সত্য রয়ে যায়—ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, অনেক সময়ই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া হয় না।
এই দুই ইস্যুর মধ্যে একটি অভিন্ন সংকট স্পষ্ট—স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতার অভাব। উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্পষ্টতা জনমনে অবিশ্বাস তৈরি করে। যখন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর বক্তব্যেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না, তখন মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে?
জনগণের পক্ষ থেকে এখন সময়ের দাবি একটাই—ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা নয়, বরং পরিষ্কার ও দৃঢ় ঘোষণা। সিআরবিতে হাসপাতাল হবে কি না, এনসিটি ইজারা দেওয়া হবে কি না—এই প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর প্রয়োজন। কারণ উন্নয়ন তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তা জনগণের আস্থা অর্জন করে এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
সবশেষে বলা যায়, সিআরবি ও এনসিটি ইস্যু এখন সরকারের জন্য একটি বাস্তব পরীক্ষা। এখানে শুধু একটি প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নয়, বরং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন জড়িত। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান, জবাবদিহিতা এবং জনমতের প্রতি সম্মান।
(লেখকঃ সাধারন সম্পাদক প্রগতির যাত্রী)
