বিজন ভাবনা (৬২):সম্পর্ক -বিজন সাহা

মস্কোর বুক ভেদ করে বয়ে চলছে মস্কো নদী। স্মলেনস্ক-মস্কো মালভূমি থেকে যাত্রা শুরু করে কলোমনা শহরের ওখানে মস্কো নদী ওকা নদীতে বিলীন হয়েছে। ৪৭৩ কিলোমিটার (পুরানো খাতে ৫০২ কিলোমিটার) দীর্ঘ এই নদীর তীরে আজ থেকে ৮৭৯ বছর আগে মানে ১১৪৭ সালে মস্কো শহরের গোড়াপত্তন করেছিলেন ইউরি দোলগোরুকি। সন্দেহ নেই যে এর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মস্কো নদী। কারণ সেই যুগে নদীই ছিল একমাত্র না হলেও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ইউরি দোলগোরুকির নামের সাথে মস্কো বাদেও এই এলাকায় ছোট-বড় অনেক শহর গড়ার ইতিহাস জড়িত। এসব শহর ছিল তখন শত্রুর আক্রমণ থেকে ভ্লাদিমির ও সুজদাল রাজ্যের সীমান্ত রক্ষা ফাঁড়ি। রুশ শিল্পে, সাহিত্যে, বানিজ্যে ও লোককাহিনীতে ভোলগা বা দনের মত অত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল না করলেও শুধুমাত্র মস্কোকে নিজের পাশে গড়ে উঠতে দিয়েই মস্কো নদী রুশ দেশের ইতিহাসে, রুশ জনজীবনে যে ভূমিকা রেখেছে তাকে এদেশের অন্য কোন নদী ছাপিয়ে যেতে পারবে কি না সন্দেহ। মস্কো কানালের মাধ্যমে মস্কো নদী ভোলগার সাথে যুক্ত করা হয় গত শতকের তিরিশের দশকে। ফলে মস্কো নদীবন্দর হিসেবেও স্থান দখল করে নিয়েছে রাশিয়ায়। এই মস্কো নদী শহরের ভেতরে উত্তর থেকে দক্ষিণে অদ্ভুত আঁকাবাঁকা পথে বয়ে চলে কখনো কখনো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গড়ে তুলেছে দ্বীপ। ঠিক এমনই একটি দ্বীপ আছে মস্কোর কেন্দ্রে। সেখানে নদীর বাম তীরে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত ক্রেমলিন, মস্কো তথা রাশিয়ার হৃদপিণ্ড। পাশেই রেড স্কয়ার। আর তার ঠিক উল্টো দিকে নদীর ওপারে দ্বীপে রয়েছে বৃটিশ দূতাবাস। সেই অর্থে মস্কো ক্রেমলিন ও রাশিয়ায় বৃটিশ দূতাবাস প্রতিবেশী।

বৃটেনের সাথে রাশিয়ার শত্রুতা কয়েক শতাব্দীর আর পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সহস্রাধিক বছরের পুরানো।‌ রাশিয়া যখন পৌত্তলিকতা থেকে বেরিয়ে আব্রাহামিক ধর্ম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন ইসলাম, রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও কনস্টানিনোপলের অর্থোডক্স চার্চ – সমস্ত জায়গায় কিয়েভ রাজ ভ্লাদিমির দূত পাঠান এসব ধর্ম সম্পর্কে জানতে, ঠিক যেমন উল্টোটাও  ঘটে, দূত এসব ধর্মে যোগ দেবার আমন্ত্রণ নিয়ে। তখন রুশ দেশের রাজধানী ছিল কিয়েভ, সেখানকার জার ভ্লাদিমির রাজমাতা ওলগার পরামর্শে পূর্ব রোম বা কনস্টান্টিনোপলের অর্থোডক্স চার্চের সাথে রাশিয়ার ভাগ্য জুড়ে দেন। আর তখন থেকেই রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্ব দুই ভিন্ন সভ্যতার পথে হাঁটতে শুরু করে। আমরা ক্রুসেডের কথা জানি যেখানে ইসলাম ও খৃষ্টান ধর্মের অনুসারী বিভিন্ন দেশ ধর্ম যুদ্ধে লিপ্ত হয়। মধ্যযুগে রুশ ও ক্যাথলিক বিশ্ব এরকম ধর্ম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল যদিও ইতিহাসে এসব ধর্ম যুদ্ধ হিসেবে স্থান না পেয়ে দুই রাজা বা রাজ্যের লড়াই হিসেবে পরিচিত। আসলে সেই যুগে বিভিন্ন দেশের ঐক্যের ভিত্তি ছিল ধর্ম তাই দিনের শেষে যুদ্ধ বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে হলেও ধর্ম সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যে শত্রুতার শুরু মনে হয় ইভান গ্রজনি বা ইভান দ্য টেরিবলের সময় থেকে। ইভান গ্রজনির অর্ধ শতাব্দীর বেশি রাজত্বকালে (১৫৩৩-১৫৪৭ যুবরাজ ও ১৫৪৭-১৫৮৪ জার হিসেবে) ইংল্যান্ড ৫ জন রাজার শাসন দেখেছে। কথিত আছে ইভান গ্রজনি ইংল্যান্ডের রাজকন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠিয়ে সাড়া পাননি। যাহোক, ইংল্যান্ড যখন ইউরোপের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয় তখন থেকেই রাশিয়াকে শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে এবং বিভিন্ন ভাবে রাশিয়ার বিরোধিতা করা তার জাতীয় রাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই হয়তো ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে রাশিয়া আমেরিকাকে সাহায্য করে। রাশিয়া ও ইংল্যান্ড ১৮০৭ – ১৮১২ সালে এবং ১৮৫৩ – ১৮৫৬ সালে (ক্রিমিয়ার যুদ্ধ) সরাসরি পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যদিও অনেক যুদ্ধেই তারা মিত্রপক্ষ ছিল। এমনকি নেপোলিয়ন ও হিটলারের বিরুদ্ধে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় পিতৃভূমির যুদ্ধে রাশিয়া ও ইংল্যান্ড ছিল পরস্পরের মিত্র। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল যুদ্ধবন্দী জার্মান সেনাদের দিয়ে নতুন সেনাবাহিনী গঠন করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানোর পরিকল্পনা করেন। পাশাপাশি তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে মস্কো, লেনিনগ্রাদ, কিয়েভ সহ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন শহরে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের জন্য প্ররোচিত করেন। সেই অর্থে ইংল্যান্ডের শাসকবর্গের রুশ বিরোধিতা জন্মগত। শুধু তাই নয়, প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাশিয়ার ক্ষতি করতেও ইংল্যান্ড কখনই পিছপা হয়নি। রুশ বিপ্লবের আগে রাসপুতিনের হত্যাকাণ্ডে মস্কোয় নিযুক্ত ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত জড়িত ছিলেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে রুশ সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাই ব্রিটেনের রাজার আত্মীয় ছিলেন। লেনিন সেই সময় ব্রিটেনের কাছে দ্বিতীয় নিকোলাইকে আশ্রয় দেবার প্রস্তাব দেন। ব্রিটেন রাশিয়ার জারকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে অস্বীকার করলে শেষ পর্যন্ত তাদের ভাগ্যে মৃত্যু নেমে আসে। ফ্রান্স ও জার্মানির সাথে ১৮১২ ও ১৯৪১-১৯৪৫ সালে রাশিয়া প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হলেও তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু ইংল্যান্ডের সাথে সে রকম সম্পর্ক কখনোই তৈরি হয়নি। তাই আজ যে ব্রিটেন ইউক্রেনের হাত দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার পেছনে অন্যতম কারিগর সেটা নতুন কিছু নয়। দুই দেশের মধ্যে কমন সীমান্ত না থাকলেও পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তাদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব ছিল। বিশেষ করে ককেসাস এলাকায় আর আফগানিস্তানে, যা ব্রিটিশ ভারত ও রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। এর ফলে সুযোগ পেলেই ব্রিটেন রাশিয়ার শত্রুকে সাহায্য করে। সোভিয়েত ইউনিয়নে দুই দেশের বিরোধিতা দুই ভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব বলেই মনে করা হত, তবে বর্তমানে মনে হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শত্রুতা এর কারণ। এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই বিশ্বাস এমন গভীরভাবে প্রোথিত যে যেকোনো সমস্যায় এরা বৃটেনের হাত দেখে।

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের পরপর ইস্তাম্বুলে দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। দুই দেশই তখন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে মত দেয়। কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরাসরি হস্তক্ষেপে ইউক্রেন কোন চুক্তি করতে অস্বীকার করে। লন্ডনের সব সরকারই ইউক্রেনের যুদ্ধ তহবিলে মুক্ত হস্তে দান করে গেছে যাতে কোন অবস্থাতেই ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে না আসে। কারণ একটাই-  রাশিয়াকে যুদ্ধের মধ্যে রেখে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে দাড় করানো, এ দেশের অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি  করা, সামরিক ভাবে রাশিয়ায়ে দুর্বল করা, এবং সময় সুযোগ বুঝে রাশিয়া আক্রমণ করে একে ছোট ছোট কয়েকটি দেশে বিভক্ত করা।

বিগত কয়েক দিন ধরে রুশ সংবাদ মাধ্যমে মস্কোয় নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হত্যার ইউক্রেনের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। বৃটিশ দূতাবাসের এক স্থানীয় রক্ষীর সাথে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা যোগাযোগ করে তাদের দূতাবাসের কাজকর্ম ও রাষ্ট্রদূত সহ অন্যদের গতিবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করতে। উদ্দেশ্য ছিল এদের উপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে রাশিয়ার ঘাড়ে চাপানো ও ক্যাসাস বেলি সৃষ্টি করে ইংল্যান্ড ও রাশিয়াকে সম্মুখ সমরে নামানো। রাশিয়া সেই রক্ষীকে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ দায়ের করেছে ও বৃটেনকে ষড়যন্ত্রের বিষয়ে অবহিত করেছে। বৃটেন যেভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নেমেছে তাতে যদি এর পেছনে এমআই-৬ এর সায় থাকে অবাক হবার কিছু থাকবে না। অন্যদিকে এটা ইউক্রেনের নিজস্ব উদ্যোগ হলে তাদের ভাবতে হবে জেলেনস্কিকে লাগামহীন সাহায্য করে তারা নিজেদের ঘরে যুদ্ধ ডেকে আনছে না তো?

 

আমার ধারণা ইউক্রেন সমস্যা শুধু রাশিয়া আর ইউক্রেনের, এমনকি রাশিয়া আর পশ্চিমা বিশ্বের সমস্যা নয়, এটা পশ্চিমা বিশ্বের অস্তিত্ব সংকট। আজকাল আমরা প্রায়ই শুনি এসব দেশে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি ঘটছে। এই প্রক্রিয়া এক দিনে শুরু হয়নি। দীর্ঘ দিন যা খুশি তাই করার, মানে স্বেচ্ছাচারিতার হোলসেল লাইসেন্স  পেয়ে পশ্চিমা বিশ্ব যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শহরে বিড়াল বা অন্য কোন প্রাণীকে মেয়র নির্বাচন করার মধ্যে লোকজন হাসির খোঁড়াক খুঁজে পেলেও এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, এটা ছিল নিজেদের শক্তিতে অন্ধবিশ্বাস। তারা বিশ্বাস করত যে তাদের সিস্টেম এতটাই নিখুঁত যে এমনকি কলাগাছ যদি প্রেসিডেন্ট হয় তাতেও দেশ ঠিকঠাক চলবে। আজ এই পশ্চিমা বিশ্বকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবার যোগ্য লোক নেই বলেই শত্রু খুঁজে বের করতে হয়। কারণ শত্রুই পারে এদের ঐক্যবদ্ধ করতে। এজন্যেই ইউরোপ যুদ্ধ থেকে বের হতে চাইছে না, তাহলে রাজা যে উলঙ্গ সেটা সবাই বুঝে যাবে। চলছে বড় ব্যর্থতা দিয়ে আগে ছোট ব্যর্থতা ঢাকার অবিরাম চেষ্টা। ইউরোপের বর্তমান সমস্যার মূলে রয়েছে তাদের অদূরদর্শী জ্বালানি নীতি, অভিবাসন নীতি আর পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতা গ্রহণে অপারগতা। এই ব্যর্থতা ইউরোপের এলিটদের। ভুল স্বীকার করার চেয়ে কারোও ঘাড়ে সেটা চাপিয়ে দেয়া সহজ। সেটা যে আরোও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে সেটা না বুঝতে পারা পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা।‌

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো