যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–৫ -ফজলুল কবির মিন্টু
২২ দিনের মজুরি: ঈদের আগে নিতুর মুখে একটু হাসি
![]()
শ্রমিকের কষ্টের গল্পগুলো খুব কমই লেখা হয়। অথচ প্রতিটি গল্পের পেছনে থাকে একটি জীবন, একটি পরিবার, কখনোবা একটি উৎসবের অপেক্ষা।
আফরোজা শারমিন নিতু—একজন নারী শ্রমিক। চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানাধীন ড্রাগনি ফ্যাশন নামের একটি পোশাক কারখানায় স্যুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন।
প্রায় এক বছর আগে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নিতুর গর্ভপাত ঘটে। শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে কিছুদিন কর্মস্থলে যেতে পারেননি। পরে সুস্থ বোধ করে আবার কাজে যোগ দিতে কারখানায় যান। কিন্তু সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি আঘাত।
তাকে কাজে যোগ দিতে দেওয়া হলো না।
কেন দেওয়া হলো না—এর কোনো মানবিক ব্যাখ্যাও তিনি পেলেন না। অসুস্থতার পর কাজে ফিরে আসা একজন শ্রমিককে সহযোগিতা করার বদলে তাকে কর্মস্থল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। হতাশ ও অসহায় নিতু শেষ পর্যন্ত বাসায় ফিরে গেলেন।
এর চেয়েও নির্মম বিষয় ছিল—গর্ভপাতের আগে তিনি যে ২২ দিন কাজ করেছিলেন, সেই মজুরিটুকুও তাকে দেওয়া হয়নি।
একজন শ্রমিকের ২২ দিনের শ্রমের মূল্য হয়তো মালিকের কাছে খুব বেশি নয়। কিন্তু একজন শ্রমিকের কাছে সেই টাকা তার সংসারের বাজার, সন্তানের খাবার কিংবা ঈদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটার টাকা।
বিষয়টি নিয়ে আমরা চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কার্যালয়ে শ্রম আইনের ১২৪(ক) ধারায় অভিযোগ করি। দেখতে দেখতে কেটে যায় প্রায় তিন-চার মাস। কিন্তু নিতুর পাওনা টাকা আদায় হচ্ছিল না। মালিকপক্ষ কোনোভাবেই টাকা দিতে রাজি ছিল না।
এভাবেই একজন শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিয়ে শুরু হয় আরেক দফা হয়রানি—
২২ দিনের শ্রমের টাকা পেতে একজন নারী শ্রমিককে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।
গতকাল বিলসের উদ্যোগে চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক জনাব আব্দুল্লাহ সাকিব মুবাররত-এর সঙ্গে একটি লবি মিটিংয়ে বিষয়টি আবারও তুলে ধরা হয়। তিনি নিতুর পাওনা টাকা আদায় করে দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন।
আজ একটু আগে নিতু ফোন করে জানালেন—
সে তার ২২ দিনের মজুরি পেয়েছে।
দুই দিন পর কুরবানির ঈদ। এই সময়ে হাতে কিছু বাড়তি টাকা এলে যে কারও ভালো লাগে। নিতুরও নিশ্চয়ই ভালো লাগছে।
হয়তো টাকার অঙ্কটা খুব বড় নয়। কিন্তু এই টাকা শুধু ২২ দিনের মজুরি নয়—এটি একজন শ্রমিকের অধিকার ফিরে পাওয়ার স্বস্তি।
নিতুর গল্প আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিল—শ্রমিকের পাওনা কখনো দয়া নয়, অনুগ্রহ নয়; এটি তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য।
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারা, তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সামান্য হলেও ভূমিকা রাখতে পারা—এ কারণেই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।
ঈদের আগে নিতুর হাতে তার ২২ দিনের মজুরি পৌঁছেছে।
এই ছোট্ট প্রাপ্তিই আজ আমার কাছে বড় আনন্দের গল্প।
(২০২৩ সালের জুন মাসের ঘটনা)