বিজন ভাবনা (৫৯): আইনের শাসন ও বিদেশে বাংলাদেশী ডায়াস্পোরা -বিজন সাহা
![]()
বাংলাদেশে অনেকেই বলে যে তারা দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা তাদের চোখে স্বাধীনতা ছিল না। অবশ্য ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতাকেও অনেকেই স্বাধীনতা মনে করেনি, তাই স্লোগান উঠেছিল – “ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়” – লাখ মানুষ যেখানে ক্ষুধার্ত এই স্বাধীনতা সেখানে মিথ্যা। আর তাই স্বাধীনতা নিয়ে আমাদের এই প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল স্বাধীনতা বলতে আমরা ঠিক কি বুঝি?
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গনের পর এক রিপাবলিক নিয়ে চুটকি প্রচলিত ছিল – এই দেশ স্বাধীন কারণ পৃথিবীর কারও ভাগ্য তার উপর নির্ভর করে না। অনেক পরে আমার এক পরিচিত প্রায়ই বলত সে সবচেয়ে স্বাধীন। এটা মনে হয় স্ত্রী, ছেলেমেয়ের প্রতি আমার দায়িত্ব দেখে। আমি ওকে বলতাম, তুমি কোন ছার, এমনকি বিল গেটসের মত মানুষও সম্পূর্ণ স্বাধীন না। কারণ, মানুষ যদি তাঁর পণ্য না কেনে, তাঁকে বয়কট করে তাহলে সেও আজকের অবস্থায় থাকবে না। পরস্পর নির্ভরশীল এই বিশ্বে সবাই সবার উপর নির্ভরশীল, কেউ বেশি, কেউ কম। যে দোকানদার তোমার কাছে খাদ্য বা পণ্য বিক্রি করে তুমি তার উপর নির্ভরশীল আবার সেও তোমার উপর নির্ভরশীল, কারণ পনয় বিক্রি না করলে তার ব্যবসা লাটে উথবে। এই যে আমরা প্রতিনিয়ত কারও না কারও কাছে যাই কোন না কোন কাজে, তাদের সবার উপর আমরা নির্ভরশীল। হয়তো বা কোন নির্জন দ্বীপে কেউ একা থাকলে সে নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা দিতে পারবে। তাই মানুষ যেমন, প্রতিটি দেশও তেমনি অন্যান্য দেশের সাথে অনেক ধরণের দৃশ্যমান বা অদৃশ্য পরাধীনতার বা নির্ভরতার সূতা দিয়ে বাঁধা।
আজকাল প্রতিটি দেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এমন ভাবে বিভিন্ন দেশের সাথে জড়িত যে কোন দেশই নিজেকে সেই অর্থে স্বাধীন বলতে পারবে না। আমেরিকা হয়তো অনেকের চেয়ে বেশি স্বাধীন, তবে তাকেও অনেকের কথা শুনতে হয়, অনেকের মতামত গ্রাহ্য করেই অনেক কিছু করতে হয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন ছার। তবে এত কিছুর পরেও, এত এত নির্ভরশীলতার পরেও অনেক ক্ষেত্রে আমরা স্বাধীন হতে পারি। কি সেটা? বিচার ব্যবস্থা। প্রতিটি দেশের বিচার ব্যবস্থা অন্যান্য ক্ষেত্রের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ আমরা যদি আমাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে অন্তত একটি বিষয়ে আমরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হব। আর এই স্বাধীনতা শুধু বিদেশী শক্তির হাত থেকে নয়, দলীয় রাজনীতির হাত থেকে তাকে স্বাধীন করা। কিন্তু বাংলাদেশে কি আমরা সেটা দেখি?
আসলে বর্তমান বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা দেখলে আমরা কতটুকু স্বাধীন, কতটুকু সার্বভৌম সেটা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। ফেসবুক এরকম খবরে ভরা যে রাশিয়া স্বল্প মূল্যে গ্যাস বিক্রি করতে চাইলেও আমেরিকার অনুমতি বিনা বাংলাদেশ তা কিনতে পারছে না। বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ ঘাটতি বিগত বছরগুলোর তুলনায় অবর্ণনীয়। অথচ রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বিদ্যুৎ ঘাটতিকে না বলা। কেন এখনও রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হচ্ছে না? এক্ষেত্রেও যদি মার্কিন হস্তক্ষেপ থাকে তাহলে অবাক হবার কিছুই থাকবে না। ধারণা করা হত যে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশের সমস্ত ব্যাপারে ভারত হস্তক্ষেপ করত। এটা ঠিক যে তখন ভারত বিভিন্ন ব্যাপারে সুবিধা নিত, কিন্তু ভারত কি এক তরফা সুবধা নিত নাকি বাংলাদেশকেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা দিত? সরকার পতনের পর দেখা গেল বাংলাদেশ ভারতের ট্র্যানজিট বেশ দক্ষতার সাথেই ব্যবহার করত। তাছাড়া সেই সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত থেকে সুবিধা আদায় করে নিয়েছে, এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলায় জিতে বঙ্গোপসাগরের জলসীমার অনেকটাই নিজের দখলে আনে বাংলাদেশ। তাই সেটা যে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ছিল না সেটা জোর দিয়েই বলা যায়। কিন্তু আমেরিকার সাথে চুক্তিতে আমরা কি নিজেদের অধিকার আদায় করতে পেরেছি? উল্টা আমাদের তৃতীয় দেশের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য আজ আমেরিকা নির্ধারণ করে। যেহেতু দেশটি এত বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে তাই স্বীকার করতেই হবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা সত্ত্বেও ২০২৪ পূর্ববর্তী সব সরকারের সাফল্যও ছিল। সেই অর্থে আমরা ২০২৪ এর পর আরও বেশি করে সার্বভৌমত্ব হারিয়েছি। সমাজতন্ত্র নিয়ে শুধু দেশে কেন পৃথিবীর কেউ কোথাও আজকাল আর খুব একটা কথা বলে না। গণতন্ত্র যে দেশে নেই বা আগেও ছিল না, সেটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আর ধর্মনিরপেক্ষতার নমুনা তো আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। আগে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য প্রায়ই ধর্মীয় ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের আক্রমণ বা জেল জরিমানা করা হত। এখন তো সরকার নিজে থেকেই একটি বিশেষ ধর্মকে প্রোমোট করছে। তাই একাত্তরের সমস্ত অর্জন আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি, হারাচ্ছি। এই যখন পরিস্থিতি তখন মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর ভাঙ্গা, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা এসব নিয়ে ভেবে কি লাভ? ভিত্তি যখন উপড়ে ফেলা হচ্ছে, তখন ডালপালা থাকলেই কী আর না থাকলেই কী?
শরীরের কোন অংশ, তা সে যত নগন্যই হোক না কেন, অসুস্থ হলে যেমন নিজেকে সুস্থ বলা যায় না, তেমনি দেশের প্রশাসনের কোন বিভাগ, দেশের কোন নাগরিক তার নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেও দেশকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলা যায় না। রাষ্ট্রের কাজ শাস্তি দেয়া নয়, রাষ্ট্রের কাজ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। আর এটা করতে গিয়ে যদি কাউকে শাস্তি দিতে হয়, সেটা করতে হবে ন্যায় বিচারের মাধ্যমে, শাসক শ্রেণীর লাভ লোকসানের কথা ভেবে নয়। কিন্তু রাষ্ট্র কি সেটা পারছে? আজও হাজার হাজার মানুষ মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত, হাজার হাজার মানুষ বিনা বিচারে জেলে বসে আছে ন্যায় বিচারের আশায়। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা নিরপরাধ, তাদের নাগরিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। যদি রাষ্ট্র সেটা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে রাষ্ট্র আসলে নিজেই ব্যর্থ হয়। ব্যর্থ রাষ্ট্র – এটা শুধু দারিদ্র কবলিত রাষ্ট্র নয়, ব্যর্থ রাষ্ট্র – যে রাষ্ট্রের প্রাশাসনিক ব্যবস্থা ভেতর থেকে পচে গেছে, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ন্যুনতম ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে কি বলতে পারি যে সে সেটা পারছে?
প্রতিটি সরকারের কর্তব্য রাষ্ট্রের এই দায়িত্বগুলো যাতে সঠিক ভাবে পালিত হয় সেটা দেখা। রাষ্ট্র বিমূর্ত। রাষ্ট্রকে অবয়ব দেয় সরকার, বিরোধী দল, আইন আদালত, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্কুল, কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। সরকারের দায়িত্ব এসব প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে চালনা করা। যদি এসব প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে চালিত না হয় এর দায় সরকারের। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা মানে সরকারের ব্যর্থতা, রাষ্ট্র ব্যর্থ মানে সরকার ব্যর্থ। যদি তাই হয়, তবে আমাদের দেশের প্রায় সব সরকারই বিভিন্ন মাত্রায় ব্যর্থ। কিন্তু আমরা নাগরিকরা কেন রাষ্ট্রের এই অবস্থা সেটা নিয়ে তো ভাবতে পারি। যে কারণেই হোক, আজ দেশে বিচারের নামে যা চলছে, যেভাবে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে, সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন ব্যতীত আর কিছুই নয়। আর তাই যদি হয় তাহলে শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় যে বিশাল বাংলাদেশি ডায়াস্পোরা রয়েছে তারা নিঃসন্দেহে নিজ নিজ জায়গা থেকে এর প্রতিবাদ করতে পারে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সেটা কোন মতেই সরকারের বা রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা হবে না, সেটা হবে দেশকে সভ্য ও আধুনিক দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের সক্রিয় প্রচেষ্টা। এতে করে শুধু দেশকেই নয়, সরকারকেও বর্তমান পরিস্থিতি বেরিয়ে আসতে সাহায্য করা হবে।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো