বিজন ভাবনা বিজন সাহা (৫৮) বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

গত ১৫ আগস্ট ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১ তম মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল চক্রান্তকারীর হাতে নিহত হবার পরে অনেক দিন তাঁর নাম নিষিদ্ধ ছিল তাঁরই বাংলায়। দীর্ঘ ২১ বছর পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এলে তিনি একটু একটু করে ফিরে আসেন সরকারি এজেন্ডায়। আর ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী শাসনামলে তিনি অনেকটা দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হন। সোভিয়েত ইউনিয়নে লেখাপড়ার সুযোগে লেনিনকে নিয়ে এ দেশের মানুষের উন্মাদনা দেখেছি, তাই শেখ মুজিবকে নিয়ে আওয়ামী লীগের অতি ভক্তি আমাকে শঙ্কিত করত। লেনিনের সৌভাগ্য যে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে রাশিয়ায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চালু হলেও লেনিনের উপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়নি। নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন সময় রেড স্কয়ার থেকে লেনিনের মমি সরিয়ে ফেলার দাবি উঠলেও সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। সেই সময় পুতিন বলেন “দেশে এখনও অনেক মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি নস্টালজিয়া অনুভব করে। লেনিনকে শ্রদ্ধা করে। এই মানুষগুলো যত দিন বেঁচে আছে তিনি ততদিন রেড স্কয়ার থেকে লেনিনের সমাধি সরিয়ে নেবার পক্ষপাতি নন, যদিও লেনিন নিজেই চেয়েছিলেন তাঁর মায়ের পাশে সমাহিত হতে। পরে নতুন শাসকরা জনমত যাচাই করে নিজেদের মত করে সিদ্ধান্ত নেবে।” তবে রাশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিমা গণতন্ত্রের অনুসারীরা পায়ের নীচে মাটি হারিয়ে ফেলেছে, তাই অদূর ভবিষ্যতে এমন দাবি উঠবে বলে মনে হয় না। এর অন্যতম প্রধান কারণ মনে হয় এখন লেনিনকে নিয়ে সোভিয়েত আমলের অতিভক্তি যেমন নেই, তেমনি নেই নব্বইয়ের তীব্র ঘৃণা।
১৫ আগস্ট মস্কো গেছিলাম বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত শোক সভায় অংশগ্রহণ করতে। গত বছরও অংশগ্রহণ করেছিলাম। আগেও ডাকত, তবে বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে যেতাম। কারণ আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের বন্ধুদের অনেকেই আমার বক্তব্য ঠিকঠাক হজম করতে পারত না। তবে চব্বিশের পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টিয়েছে। প্রতিক্রিয়া হলেও সেটা তাৎক্ষণিক নয়। তাই মন খুলে নিজের কথা বলা যায়। তাছাড়া সরকার বিভিন্ন ভাবে আমাদের নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে। তাই ১৫ আগস্ট শোক দিবস পালন করা বা করতে না দিলে মনে মনে শেখ মুজিবকে স্মরণ করা আমি ব্যক্তিগত প্রতিবাদ বলে মনে করি। আর তাই একাত্তরের পক্ষে যেখানেই কথা বলা হোক না কেন সেখানে উপস্থিত থাকার বা সংহতি জানানোর চেষ্টা করি।
বলতে বাঁধা নেই যে চব্বিশের পর আমার বন্ধুরা দুই শিবিরে বিভক্ত। একদল যে করেই হোক স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি চেয়েছে, এমনকি তা যদি একাত্তরের বিনিময়েও হয়। আরেক দল একাত্তরকে কখনই চব্বিশের সাথে বিনিময় করতে চায়নি। আর স্বীকার করি বা না করি, এখনও একাত্তরের পক্ষে যারা কথা বলে, কিছুটা হলেও একাত্তরকে যারা ধারণ করে তাদের বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের কর্মী বা সমর্থক। এটা বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতার জন্য আমরা নিজেরাও দায়ী। আওয়ামী লীগের হাত ধরেই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। অন্যদের যে সেখানে অবদান ছিল না তা নয়, তবে আওয়ামী লীগ ছিল ফ্রন্ট লাইনে। তাই আমরা নিজেরাই যখন আওয়ামী লীগকে তীব্র ঘৃণার পাত্রে পরিণত করি, নিজেদের অজান্তে আমরা নিজেরাই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীনতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করি। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, আমরা নিজেরা নিজেদের একাত্তরের মুখোমুখি দাড় করাই। মাছি ফেলতে গিয়ে আমরা কাটলেট ফেলে দেই। আর এসব কারণে আওয়ামী লীগের অনেকের সাথে নতুন করে যোগাযোগ হয়। এছাড়া আমার লেখা পড়ে অনেকেই নিজে থেকেও যোগাযোগ করে। তাই হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কর্মীদের মনোভাব সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়। যদিও চব্বিশের পরিবর্তনের পরে ব্যক্তিগত কথাবার্তায় অনেকেই নিঃসঙ্কোচে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সমালোচনা করে তবে সভায় আত্মসমালোচনা দেখলাম না বললেই চলে। আসলে মানুষ সামাজিক জীব। ব্যক্তিগত জীবনে সে যতটা স্বাধীনভাবে কোন বিষয়ে মতামত দিতে পারে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে তা পারে না। এরকম একটি এক্সপেরিমেন্টের কথা শুনেছি। একটি স্কুলে বাচ্চাদের হাতে একটি কমলালেবু দিয়ে জিজ্ঞেস করা হয় “এটা কি?” সবাই উত্তরে বলছে “এটা আপেল।” এভাবে শিক্ষক যখন শেষ বাচ্চার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন “এটা কি?” সে একটু দ্বিধা করে বলল, “এটা আপেল।” আমার ঠিক মনে নেই অন্য ছেলেদের এটা বলতে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল কিনা, তবে শেষে বাচ্চার কাছ থেকে তিনি “কমলালেবু” উত্তর আশা করছিলেন। সবাই চলে গেলে তিনি সেই ছেলেকে আবার ফলটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন “এটা কি?” এবার সে সঠিক উত্তর দেয়। “তুমি কি তাহলে আগে আপেল দেখেছিলে?” শিক্ষক জিজ্ঞাসা করেন। ছেলেটি বলে, “আমি প্রথম থেকেই জানতাম যে এটা কমলালেবু। তবে সবাই যখন আপেল বলছিল, তখন ধীরে ধীরে নিজের বিশ্বাসটা দুর্বল হচ্ছিল। আর পরে সবাই হাসাহাসি করতে পারে সেটা ভেবে সবার মত বলেছি এটা আপেল।” বিষয়টা সত্য বা মিথ্যার নয়, এটাকে বলে জনতার দর্শন বা ক্রাউড ফিলোসফি। নিজের কাছে আমরা যেটা ঠিক বলে জানি অনেকের মধ্যে গিয়ে অন্যদের কথা শুনে প্রায়ই নিজেদের মত বদলাই, অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে আরও বেশি কুল হিসেবে দেখানোর জন্য অন্যদের চেয়ে জোরে তাদের মতামত প্রচার করি।
আগে বন্ধুরা যখন কারণে অকারণে নেতাদের প্রশংসা করত, ওদের জিজ্ঞেস করতাম, ওরা এভাবে নেতাদের নষ্ট করছে কেন? সেটা কেউ খুব একটা পাত্তা দিত না। এখনও মনে হয় দেয় না। তাদের ধারণা কারণে অকারণে প্রশংসা করে তারা নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে আর অন্যদের চোখে নিজেদেরকে নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসেবে প্রমাণ করতে পারছে। আসলে এতে করে তারা যে নিজেদের অগোচরে নেতা ও দলের ক্ষতি করছে সেটা অনেক সময় বুঝতে পারে না। লোকজন অকারণে নিজের প্রশংসা শুনলে এক সময় নিজের শক্তিতে অতিরিক্ত বিশ্বাস করতে শুরু করে। ফলে সে অচিরেই নিজের দুর্বলতা সম্পর্কে অসতর্ক হয়ে পড়ে। নিজেও যে ভুল করতে পারে সেটা আর বিশ্বাস করে না। সেখান থেকেই শুরু হয় একের পর এক ভুল। কথায় বার্তায়, কাজে কর্মে তাদের মধ্যে দেখা যায় দাম্ভিকতা। একটা ভুল ঢাকার জন্য আরেকটি ভুল করি, আমরা সবাই এমন একটা কাঁধ খুঁজি যেখানে নিজের ব্যর্থতার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যায়। বিশ্বে ঈশ্বরের পর সেই গুরু দায়িত্ব পালন করে আমেরিকা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিরোধী দল, তা সে সক্রিয় থাকুক বা নিষিদ্ধ হোক। আওয়ামী ভার্সনে তা বিএনপি, জামায়াত ও অন্যরা। আমরা ভুলে যাই যে সব বিরোধী দলের কাজ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। তারা সে কাজে সফল হয় সরকারের ব্যর্থতাকে ব্যবহার করেই। এই ব্যর্থতা শুধু চব্বিশের নয়, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত করে, মৌলবাদীদের তোষণ করে আওয়ামী লীগ নিজেই নিজেকে এই অবস্থায় নামিয়ে এনেছে। যতক্ষণ না এই ভুল স্বীকার না করা হয় ততক্ষণ সেটা শোধরানো যাবে না।
প্রায় সব দেশেই রাজনীতি মিথের উপর প্রতিষ্ঠিত, তবে বাংলাদেশে রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত মিথ্যার উপর। অথবা বলা চলে কোন ঘটনার বিকৃত ইন্টারপ্রিটেশনের উপর। শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশের স্থপতি নন, ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। পূর্ব বাংলায় তিনিই পাকিস্তান আন্দোলন এলিটের বৈঠকখানা থেকে বের করে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। তিনি অন্তর থেকেই বিশ্বাস করতেন যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলার গরীব মুসলমানের মুক্তি আসবে। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পরে তিনি যখন বুঝতে পারলেন পূর্ব বাংলা ইংরেজের পরিবর্তে পাঞ্জাবের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে, তখন তিনি নতুন করে বাংলার মানুষের মুক্তির পথ খুঁজতে শুরু করেন। একদিকে আওয়ামী লীগ ও মুজিব বিরোধী সব শক্তি যেমন পাকিস্তান সৃষ্টিতে তাঁর অবদানের কথা অস্বীকার করে, অন্যদিকে মুজিব ভক্তরা এটাকে তাঁর সুদূরপ্রসারী চাল বলে প্রচার করে এভাবে যে যেহেতু ভারত ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টি সম্ভব ছিল না, তাই তিনি প্রথমে পাকিস্তান সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা নেন। আবার জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান সৃষ্টির বিরুদ্ধে যেমন তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। সেদিক থেকে তারা সবসময়ই শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যদি বিএনপির কথা বলি, তাহলে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ প্রথমে নিজের নামে, পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়া ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনে জিয়াউর রহমানের কোন ভূমিকা ছিল না। তিনি সেই সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। কিন্তু এখন তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপির চেষ্টার শেষ নেই। বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান তাদের নিজ নিজ অবদানের জন্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। এখন ইতিহাস বিকৃত করে তাঁদের নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা তাঁদেরকে আর যাই করুক, মহান করে না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু যে সত্যিই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছিলেন ও পরবর্তীতে পাকিস্তানী শাসকদের পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের কারণে তিনি স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন নতুন প্রজন্মকে এটা জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একমাত্র তাহলেই তাদের বঙ্গবন্ধু ও পাকিস্তান সম্পর্কে ভুল ধারণা ভাঙতে পারে। তাঁকে নিয়ে যেকোন মিথ্যা বয়ান আসলে স্বাধীনতা বিরোধীদের অবস্থানকেই শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশের রাজনীতি মূলতঃ প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার রাজনীতি। ঠিক ২৫ বছর আগে ২০০১ সালের ২১ আগস্টের বোমা হামলার পর থেকে এটা সিস্টেম্যাটিক রূপ পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার যেমন বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর জন্য রাজনীতি কঠিন করে তুলেছিল, ইউনুস সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগকে তেমনি মাঠে নামতে দিচ্ছে না, আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে, তুলছে। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে না। যতদিন ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলের প্রতি ক্ষমাশীল না হবে ততদিন এই চক্র ভাঙবে না। তার মানে কিন্তু সাধারণ ক্ষমা নয়। ক্ষমতায় থাকাকালীন যদি কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইন বহির্ভূত কাজ করে, তাহলে প্রচলিত আইনের মাধ্যমে তাদের বিচার অবশ্যই করতে হবে। তবে নেতৃত্বের বা কোন নেতার ভুলের জন্য সমস্ত দলের উপর, দলের কর্মী, সমর্থকদের উপর নির্বিচারে স্টীম রোলার চালালে সেটা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়। শুধু মিটিং মিছিল করে, স্লোগান দিয়ে শেখ মুজিবের সেনা হওয়া যায় না, তাঁকে ধারণ করা যায় না। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে বঙ্গবন্ধু শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রে আস্থা রেখেছিলেন। তাই তাঁর আদর্শের অনুসারী হতে হলে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক জীবনেও গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করতে হয়, এসব ধারণ করতে হয়। মানুষ মরণশীল কিন্তু তার কর্ম, তার আদর্শ অমর হতে পারে শুধু অনুসারীদের এই আদর্শ ধারণ করার মধ্য দিয়ে।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো