বিজন ভাবনা (৫৭): শেখ হাসিনার সাংবাদিক সম্মেলন – বিজন সাহা

গত ০৫ আগস্ট, ২০২৬ ক্ষমতাচ্যুত হবার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে শেখ হাসিনা এক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আর বিগত দুই বছরে বিশেষ করে ইউনুস সরকারের নজীরবিহীন দুর্নীতি ও অরাজকতার রিপোর্ট। পটভূমি না জানা থাকলে অনেকেই এটা আওয়ামী লীগ সরকারের বার্ষিক রিপোর্ট বলে ভুল করতে পারত।
তিনি আবারও গণতন্ত্র, আইনের শাসন ইত্যাদি নিয়ে কথা বললেন। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হল যে রাজনৈতিক দলগুলো শুধু ক্ষমতার বাইরে থাকাকালীন সময়ে আইনের শাসন, গণতন্ত্র, সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও পরিবেশ চায়, কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর, যখন সত্যিকার অর্থেই তারা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে তখন তারা গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জনগণের নিরাপত্তা সহ অন্যান্য বিষয় ঘিরে তাদের স্বপ্নের কথা, জনগণকে দেয়া তাদের প্রতিশ্রুতির কথা বেমালুম ভুলে যায়। এখন জনগণের সাথে, জনগণের পাশে থাকার কথা বললেও কেন ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তিনি জনগণের পাশে থাকলেন না আর জনগণই বা কেন তাঁকে ত্যাগ করল সেটা নিয়েও কোন কথা বললেন না। তবে তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে জনগণের অধিকারের জন্য লড়াই করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই শেখ হাসিনার কাছ থেকে অনুশোচনা মূলক বক্তব্য শুনতে চেয়েছিল, কিন্তু তাঁর বক্ত্যব্যে কোন অনুশোচনা ছিল না, ছিল অন্যদের প্রতি অভিযোগ। শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে ঘটিত কোন দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করেননি বা অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। এই নিয়ে সমাজে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ এটা ভালো ভাবে নিচ্ছে না, আবার কেউ কেউ কেন শুধু শেখ হাসিনাকেই দায় স্বীকার করতে হবে এই প্রশ্ন তুলছে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াত বা ২১ আগস্টের ঘটনায় বিএনপি দায় স্বীকার করেনি এই অজুহাতে।
আমার মনে হয় শুধুমাত্র ২০২৪ এর জুলাই আগস্টের ঘটনা নয়, ২০১৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার জন্য শেখ হাসিনা ভুল স্বীকার করতে পারতেন। আদালতের রায় পাওয়ার পরও বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করতে পারতেন। শাহবাগ আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল সেটাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটতে পারত। সেই সুযোগ হাতছাড়া করার জন্য দুঃখিত হতে পারতেন। ঐ সময়ে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের পরেও তাদের সঙ্গে পরবর্তী পর্যায়ে আপোষ করে চলা, তাদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে পাঠ্যক্রম থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শীর্ষ স্থানীয় কবি সাহিত্যিকদের রচনা বাদ দেয়া, মাদ্রাসার ডিগ্রিকে সাধারণ ডিগ্রির সমান মান দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মাদ্রাসায় পরিণত করা, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরি, ক্লাব এসবের পরিবর্তে মডেল মসজিদ নির্মাণ বা পূজা উদযাপনের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়, যা দেশকে আজকের অবস্থায় নিয়ে এসেছে, এজন্য তিনি অনুশোচনা করতেই পারতেন।
আমি ও আমার মত অনেকেই সেই সময়ে এসবের সমালোচনা করলেও চব্বিশের জুলাই আগস্টে এভাবে সরকার পতনের বিরোধিতা করেছিলাম সেই শঙ্কা থেকে যে এর ফলে যে অরাজকতার সৃষ্টি হবে তাতে জামায়াত শিবিরের হাতে ক্ষমতা চলে যাবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের ধারণা সঠিক ছিল। আর এ কারণেই চব্বিশ পরবর্তী সময়ে আমরা চেয়েছি যে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসুক, দেশে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠুক।
গত ফেব্রুয়ারিতে যখন আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তখন প্রথম বারের মত বিএনপিকে সমর্থন করি যাতে মৌলবাদীরা অফিসিয়ালি ক্ষমতায় আসতে না পারে। এর একটা প্রধান কারণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ৩২ নম্বর ভাঙচুর এসবের সাথে জড়িত থাকার পরেও বিএনপির কারণেই আলী রিয়াজদের পক্ষে সংবিধানের খোলনলচে পাল্টে ফেলা সম্ভব হয়নি। আর ফজলুর রহমান সহ বিএনপির কিছু নেতা মবের হুমকি উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অনবরত কথা বলে গেছেন। বিএনপি নির্বাচনের আগে যদিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার ব্যাপারে কোন রকম প্রতিশ্রুতি দেয়নি তারপরেও আমরা আশা করেছিলাম নিজ দল ও দেশের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে মনোযোগ দেবে, ইউনুসের আমলে আওয়ামী লীগের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। বাস্তবে হয়েছে উল্টো। তাই আজ শেখ হাসিনা যখন তাঁর যেসব ভুলের কারণে দেশের এই দুর্গতি হল সেসব স্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করেন তখন বিপদ তাড়িয়ে আপদ আনার প্রয়োজন আছে কিনা সেটাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত করার পেছনে আওয়ামী লীগের অবদান কম নয়। এখন আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, মেটিকুলাস প্ল্যানের যতই পিন্ডি চটকাই না কেন আওয়ামী লীগ নিজের রাজনীতি দিয়েই নিজেকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে।
স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রেস কনফারেন্সের প্রতি জনমনে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিভিন্ন কারণে তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন মানুষের অভাব ছিল না। তবে গত দুই বছরে দেশের পরিস্থিতি এমন অবস্থায় নেমে গেছে যে অনেকেই শেখ হাসিনার আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছে। ভালো বিকল্প না থাকলে মানুষ দুই খারাপের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত কম খারাপকে বরণ করবে এটাই স্বাভাবিক। আর তাই এই প্রেস কনফারেন্স এত আগ্রহের সৃষ্টি করে। বেশ কিছুদিন থেকেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন এরকম কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল। তবে এ নিয়ে সন্দেহ কম ছিল না। তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে সেই জল্পনার অবসান ঘটালেন। এ ব্যাপারে সরকারের মন্ত্রীরা বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করতে শুরু করে। এ থেকে আমার অনেক দিনের এক পুরানো ধারণা যে মিথ্যা নয় তার কিছু প্রমাণ মেলে। বিগত সরকারের আমলে মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা বিভিন্ন বিষয়ে মতামত প্রকাশ করতেন। এখনও নতুন সরকারের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা সেটাই করে যাচ্ছেন। যেহেতু আমাদের দেশে সব রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতার ইচ্ছা অনিচ্ছায়, তাই মনে হয় বাঁচাল মন্ত্রীর চেয়ে বোবা মন্ত্রী অনেক ভালো। এক্ষেত্রে অন্তত মন্ত্রীদের উল্টোপাল্টা কথাবার্তা খন্ডনে নতুন মিথ্যার অবতারণা করতে হবে না।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়া তিনি একজন মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি। সেক্ষেত্রে কোথায় মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা আনন্দিত হবে তা না, উল্টো কেউ তাঁকে জেলের ভয় দেখায়, কেউ দেশে ঢুকতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা করে। তবে যাদের একটু চিন্তাশক্তি আছে তারা বুঝতে পেরেছিল যে ভারত সরকার যদি শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়, তবে সেটা তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই করবে আর সেক্ষেত্রে আমেরিকার পক্ষ থেকে স্বীকৃতি আদায় করেই করবে। কি দাঁড়ালো তাদের লম্ফঝম্পের পরিণাম? মার্কিন বিশেষ দূতের আগমন, ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথে তারেক রহমানের সাক্ষাৎ ও র’এর পরিচালকের ঢাকা আগমনের পর সরকার শেখ হাসিনার আগমনের ব্যাপারে সম্মতি দেয়। এখন মানুষ এটাকে সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে গ্রহণ করবে।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে দেশে ফেরার ঘোষণা দেননি, বলেছেন যে তিনি নিজেকে আদালতে সমর্পণ করে আইনি লড়াইয়ে মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন। এক্ষেত্রে তাঁকে দেশে স্বাগত জানিয়ে বিএনপি জনগণের চোখে নিজেকে ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারত। প্রথমে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথে বাধা সৃষ্টি করে ও পরে আমেরিকা ও ভারতের চাপে শেখ হাসিনাকে আসতে দেবার ঘোষণা করে বিএনপি নিজেকে রাজনৈতিক ভাবে আরেকটু দেউলিয়া করল। আসলে জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে রেখে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
কথায় আছে অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি। সততার কোন বিকল্প নেই। আর সবার আগে সৎ হতে হয় নিজের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে। শেখ হাসিনা যদি সত্যিই বাংলা ও বাঙালি জাতিকে ভালোবাসেন, শেখ মুজিবুর রহমানের মত বাংলা ও বাঙালি জাতির মুক্তি ও বিকাশের জন্য যেকোনো ধরণের আত্মত্যাগে প্রস্তুত থাকেন তাহলে তাঁর যেসব পদক্ষেপ এই ভূমিতে মৌলবাদের বিকাশে ইন্ধন যুগিয়েছে ও বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেসব পদক্ষেপকে ব্যর্থতা মেনে ভুল স্বীকার করার বিকল্প নেই। আজকের বাংলাদেশ তাঁর ভুল রাজনীতির ফল, মৌলবাদ তোষণ নীতির ফলে। একক ভাবে না হলেও আংশিক ভাবে তিনি যে দায়ী এটাকে স্বীকার করেই তাঁকে নতুন করে যাত্রা শুরু করতে হবে। জীবনে সাফল্য ব্যর্থতা সবই থাকে। সব সাফল্যের গৌরব সব ব্যর্থতার গ্লানি মুছে ফেলতে পারে না। অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ঢাকা যাবে না। মূলতঃ বিগত দের যুগের নৈতিক অধঃপতন ও চরম দুর্নীতির ফল আজকের বাংলাদেশ। এর দায় শেখ হাসিনা এড়াবেন কীভাবে?
গৃহস্থের অনুমতি নিয়ে বাড়ীতে চোর বা ডাকাত পড়ে না। কিন্তু বাড়িতে চোর বা ডাকাত পড়লে বিচক্ষণ গৃহস্থ এর দায় নিজের কাঁধে নেয় আর ভবিষ্যতে যাতে এমনটা না ঘটে সেজন্য প্রথমে ভুল স্বীকার করে, তারপর ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করে। বিদেশি ষড়যন্ত্রে হোক আর বিরোধী রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে হোক, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন ভেঙে পড়ে আর এতে করে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তার দায় সরকার এড়াতে পারে না। সৎ মানুষ, সৎ নেতা এসব ব্যর্থতা স্বীকার করেই সামনের দিকে অগ্রসর হয়। দায়িত্ব অস্বীকার করলে তার সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ভুল স্বীকার দুর্বলতা নয়, ভুল স্বীকার না করার জন্য অজুহাত সৃষ্টি সত্যিকারের দুর্বলতা। বিগত দেড় বছরে অনেক নিবেদিত প্রাণ আওয়ামী লীগ কর্মীদের সাথে কথা বলে বুঝেছি যে তারা দলে জামায়েত শিবিরের অনুপ্রবেশ, মৌলবাদীদের সাথে আপোষ, রাজনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত করা ইত্যাদির জন্য যে শেখ হাসিনার রাজনীতি অনেকাংশেই দায়ী সেটা স্বীকার করে। আর তাই যদি হয়, এমনকি তাঁর নিজের দলের কর্মীদের আস্থা ফিরে পাবার জন্যেও এসব প্রশ্নে নিজের ভুল স্বীকার করার বিকল্প নেই। শুধু ইউনুস ও বিএনপি সরকারের ভুলের উপর নির্ভর করে রাজনীতিতে হয়ত ফিরে আসা যাবে, কিন্তু মানুষের আস্থা ও ভালবাসা ফিরে পেতে হলে আগের ভুল স্বীকার করতেই হবে। আশা করব দেশে ফেরার আগেই সেই সৎ সাহস তিনি দেখাবেন।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো
