রাখাইনের যুদ্ধকে পুঁজি করে বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট–সার পাচার বৃদ্ধি, বিনিময়ে আসছে ইয়াবা
নিজস্ব প্রতিবেদক
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, বৈধ বাণিজ্যের স্থবিরতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, সার, ডিজেল, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ পণ্য জব্দ হলেও সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র সক্রিয় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া পণ্যের বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে ইয়াবা দেশে প্রবেশ করছে, যা সীমান্ত নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম উপকূলের পাশাপাশি কক্সবাজারের টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন সংলগ্ন সমুদ্রপথ এবং নাফ নদী বর্তমানে চোরাচালানের প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। গভীর রাতে ছোট কার্গো নৌকা ও মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে এসব পণ্য রাখাইনের মংডুসহ বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, রাখাইনে দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে বৈধ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। নির্মাণসামগ্রী, কৃষি উপকরণ এবং জ্বালানির তীব্র সংকট সৃষ্টি হওয়ায় সেখানে এসব পণ্যের দাম বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এই বিশাল মূল্য ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা বিপুল মুনাফা করছে।
তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে বর্তমানে এক বস্তা সিমেন্টের দাম ৩২ হাজার থেকে ৪২ হাজার কিয়াত পর্যন্ত, যা প্রায় ২০ মার্কিন ডলারের সমান। অন্যদিকে বাংলাদেশে একই বস্তা সিমেন্ট সর্বোচ্চ ৫ ডলারের সমপরিমাণ মূল্যে পাওয়া যায়। একইভাবে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার কিয়াত এবং ডিএপি সারের দাম প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কিয়াত। ফলে চট্টগ্রামের সিইউএফএল, কাফকো ও ডিএপি কারখানায় উৎপাদিত সারের একটি অংশ চোরাইপথে রাখাইনে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি কোস্ট গার্ডের এক অভিযানে তিনটি কার্গো নৌকা থেকে ২ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট ও ২৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ২২ জনকে আটক করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, এসব পণ্য মিয়ানমারের মংডু এলাকায় পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, সারের বস্তায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) লোগো ব্যবহার করে পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
এর আগে বঙ্গোপসাগর হয়ে রাখাইনে সার পাচারের সময় আরও ১১ জনকে আটক করে কোস্ট গার্ড। একই সময়ে নৌবাহিনী কুতুবদিয়া উপকূলে অভিযান চালিয়ে ৬৫০ বস্তা সিমেন্ট, এক হাজার লিটার ডিজেল এবং একটি নৌযান জব্দ করে। আটক ব্যক্তিরা অধিক লাভের আশায় এসব পণ্য মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে নৌবাহিনী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে সরকার কৃষকদের জন্য ভর্তুকি দিয়ে কম দামে সার সরবরাহ করে। কিন্তু যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং সরবরাহব্যবস্থার ভাঙনের কারণে মিয়ানমারে ইউরিয়া, ডিএপি সার ও সিমেন্টের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এই মূল্য বৈষম্যই চোরাচালান বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে আরাকান আর্মি বাংলাদেশ-সংলগ্ন সীমান্তের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বৈধ সীমান্ত বাণিজ্য আরও সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, মাদক, অস্ত্র, মানবপাচারের পাশাপাশি পণ্য পাচারের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চোরাচালানকারীরা সাধারণত গভীর রাতে নির্জন উপকূলীয় ঘাট থেকে পণ্য ট্রলারে তুলে নাফ নদী ও সমুদ্রপথে রাখাইনের উপকূলে পৌঁছে দেয়। অনেক সময় মাছ ধরার ট্রলারের ছদ্মবেশ ব্যবহার করে তারা নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের টহল এড়িয়ে যায়। আবার ট্রলারে বিশেষ কৌশলে পণ্য লুকিয়েও পাচার করা হয় বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, মিয়ানমারে পাচার হওয়া সার, সিমেন্ট, ডিজেল ও ওষুধের বড় অংশই সরকারের ভর্তুকিপ্রাপ্ত অথবা মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানিকৃত। ফলে এই চোরাচালান দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে পণ্যের বিনিময়ে ইয়াবা দেশে প্রবেশ করায় মাদক পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতিতে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন উপকূলে সমন্বিত নৌ টহল জোরদার, সার ও সিমেন্টের সরবরাহ শৃঙ্খলে কঠোর নজরদারি, সীমান্তঘাটে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং চোরাচালান চক্রের অর্থদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার সুপারিশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, মিয়ানমারের সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ থেকে ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি উপকরণ ও নির্মাণসামগ্রী পাচারের প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
