চলমান সংবাদ

সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক, সমন্বয় জোরদারের আশ্বাস

ঢাকা, ২১ জুলাই: সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সরকার পরিচালনা, শরিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয়, আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে শরিক নেতাদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন প্রধানমন্ত্রী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকার পরিচালনায় শরিক দলগুলোর মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জোটকে আরও সুসংহত করার লক্ষ্যেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। নির্বাচনের আগে বিএনপি জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকারে মাত্র তিনটি শরিক দলের তিনজন নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করায় কয়েকটি দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটেও বৈঠকটি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবলু, শাহাদাত হোসেন সেলিম, ফরিদুজ্জামান ফরহাদসহ যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন শরিক দলের শীর্ষ নেতারা।

বিএনপির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।

তবে আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) বৈঠকে অংশ নেয়নি। দলটির পক্ষ থেকে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, জুলাই সনদ, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আগে বিএনপির সঙ্গে পৃথক রাজনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ দলের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সব রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণে জাতীয় সংলাপ হলে জেএসডি তাতে অংশ নেবে বলে জানানো হয়েছে।

একইভাবে আমন্ত্রণ পেয়েও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বৈঠকে অংশ নেয়নি। দলটির মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী জানান, এটি তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত; তবে এ সিদ্ধান্তের কারণ আপাতত প্রকাশ করা হবে না।

বৈঠকে শরিক নেতারা সরকার গঠনের পর বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন। কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন, স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শরিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হয়নি। এতে বিএনপি “একলা চলো” নীতি অনুসরণ করছে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।

পড়ুন:  এক মাসে বিএনপি সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক মহলে

এছাড়া সরকার গঠনের পর মাঠপর্যায়ে যুগপৎ আন্দোলনের রাজনৈতিক কার্যক্রম দৃশ্যমান না থাকা, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। একজন নেতা বৈঠকের আমন্ত্রণ জানানোর প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও মর্যাদাপূর্ণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত ছিল।

বৈঠকের শেষদিকে পরিবেশ কিছুটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এক শরিক নেতা রসিকতা করে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে জানতে চান, এই নৈশভোজ কি “ফেয়ারওয়েল ডিনার”। জবাবে প্রধানমন্ত্রী হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, “না, এটি ওয়েলকাম ডিনার।”

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকায় নিয়মিত রাজনৈতিক বৈঠক করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার জনগণের কাছে পৌঁছাতে কৃষিঋণ, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় নেতা ও খেলোয়াড়দের ভাতা, খাল পুনঃখননসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

তিনি আরও বলেন, সরকার একটি “ধ্বংসস্তূপ” থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে শরিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় এবং আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর এ বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের আন্দোলন, কারাবরণ, মামলা, গুম ও হত্যার স্মৃতিচারণায় বৈঠকে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তিনি জানান, শরিক দলগুলোর নেতারা সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান আইনে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং নৈশভোজে অংশ নেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা এবং সমন্বয়ের নতুন বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে।