চলমান সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঝড়: দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতায় ক্ষমতার পথে, ভরাডুবি তৃণমূলের

নিজস্ব প্রতিবেদন:
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নজিরবিহীন ফলাফলের ইঙ্গিত মিলেছে। ভোট গণনার ধারাবাহিক ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টির ফলাফলে বিজেপি ২০৬টির বেশি আসনে জয়ী বা এগিয়ে রয়েছে, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়–এর দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ৮০টির মতো আসনে সীমাবদ্ধ।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজ আসনেই বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী–এর কাছে পরাজিত হয়েছেন। ফল ঘোষণার আগেই তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ করেন, শতাধিক আসনে ‘লুটপাট’ হয়েছে।

২০১১ সালে বামফ্রন্টকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসা তৃণমূল কংগ্রেস টানা ১৫ বছর রাজ্য শাসনের পর এবার বড় ধাক্কা খেল। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণের পথে এগিয়ে গেল বিজেপি, যা একসময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়–এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দাবি করে আসছে।

একতরফা ফল, ভেঙে গেল পূর্বাভাস

ভোটের আগে অধিকাংশ বুথফেরত সমীক্ষায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দেখা গেছে একতরফা ফলাফল। উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও কালিম্পংসহ একাধিক জেলায় তৃণমূল একটি আসনও পায়নি। একই চিত্র দক্ষিণবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলাতেও।

বিজেপির ভোটের হার বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে তৃণমূল নেমে এসেছে প্রায় ৪১ শতাংশে। গতবারের তুলনায় বিজেপির আসনসংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার পথে।

বিজেপির জয়ের পেছনে তিন বড় কারণ

বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই সাফল্যের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে—

১. ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর):
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে প্রায় এক কোটি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন বলে অভিযোগ। এতে বিশেষ করে মুসলিম ও মতুয়া সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব পড়ে। তবে প্রত্যাশার বিপরীতে মতুয়া ভোটের একটি বড় অংশ বিজেপির দিকেই গেছে।

২. নির্বাচন কমিশনের কড়া ভূমিকা:
নির্বাচন কমিশন রাজ্য প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে এবং বিপুলসংখ্যক সিসিটিভি ক্যামেরা বসায়। প্রায় সাড়ে ছয়শ প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়, যা ভোটের পরিবেশে বড় পরিবর্তন আনে।

পড়ুন:  পশ্চিমবঙ্গে ভোটে এআই নজরদারি, প্রতিটি বুথে লাইভ ক্যামেরা

৩. কেন্দ্রীয় চাপ ও প্রচার:
দুর্নীতির অভিযোগে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থার তৎপরতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে মোদি–শাহর নিবিড় প্রচার বিজেপির পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং সামাজিক প্রকল্প দ্বিগুণ করার আশ্বাস ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে।

রাজনৈতিক পালাবদলের আঞ্চলিক প্রভাব

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সম্ভাব্য এই বিজয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলে তাদের প্রভাব আরও বিস্তৃত হলো। ইতোমধ্যে ত্রিপুরা ও আসামে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি এবার পশ্চিমবঙ্গেও সরকার গঠনের পথে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি, যা এতদিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে আটকে ছিল, তা নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

এছাড়া, সীমান্ত রাজনীতিতে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যু এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক ভারসাম্যে এই ফলাফল নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

উপসংহার:
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনী ফল শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি ভারতের জাতীয় রাজনীতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই পরিবর্তন কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর বাস্তব প্রভাব কী দাঁড়ায়।