মে দিবসের মায়াকান্না, শ্রমিকের অন্ধকার বাস্তবতা -ফজলুল কবির মিন্টু

প্রতি বছর পহেলা মে এলে আমরা শপথ করি—শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবো, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করবো, মানবিক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলবো। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, এমনকি শ্রমিক সংগঠন—সবাই তখন শ্রমিকবান্ধবতার প্রতিযোগিতায় নামে। বক্তৃতা, সমাবেশ, শোভাযাত্রা—সব মিলিয়ে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—২ মে সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই শ্রমিক কী পায়?
বাস্তবতা নির্মম। যে তিমিরে শ্রমিক ছিল, সেখানেই সে রয়ে যায়।
বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ আজও ৮ ঘণ্টা কাজ করে যে মজুরি পায়, তা দিয়ে একটি পরিবারের মাসের অর্ধেক সময়ও চলে না। ফলে বাধ্য হয়ে তারা অতিরিক্ত কাজ খুঁজে—ওভারটাইম নয়, প্রায়শই দুই শিফট। জীবন বাঁচাতে, পরিবার টিকিয়ে রাখতে তারা নিজের শরীরকে পণ্যে পরিণত করতে বাধ্য হয়। শ্রমিকের কাছে তখন “৮ ঘণ্টা কাজ” একটি অধিকার নয়, বরং এক অলীক স্বপ্ন।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে ঠিকাদারভিত্তিক নিয়োগের নতুন এক শোষণব্যবস্থা। এসব শ্রমিকের নেই স্থায়ী নিয়োগ, নেই শ্রম আইনের সুরক্ষা, নেই ন্যূনতম অধিকার। সাপ্তাহিক ছুটি তো দূরের কথা—অনেকে মাসে মাত্র দুইদিন ছুটি পায়। সবেতন ছুটি, চিকিৎসা সুবিধা, চাকরির নিরাপত্তা—এসব যেন তাদের জীবনের বাইরে থাকা শব্দমাত্র।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই কঠোর পরিশ্রমের পরও তারা এমন মজুরি পায় না, যা দিয়ে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব। বাস্তবতা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, ২৪ ঘণ্টা কাজ করলেও জীবনধারণের উপযোগী আয় নিশ্চিত হয় না।
অথচ ইতিহাস অন্য কথা বলে। এদেশের শ্রমজীবী মানুষই মুক্তিযুদ্ধের মেরুদণ্ড ছিল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে, এবং সাম্প্রতিক গণআন্দোলনগুলোতেও তাদের অবদান ছিল অগ্রগণ্য। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে শ্রমিক শ্রেণি তাদের ত্যাগ ও সংগ্রামের স্বাক্ষর রেখেছে। কিন্তু রাষ্ট্র কি তাদের সেই অবদানের যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে?
দুঃখজনকভাবে, উত্তরটি না।
মে দিবস এখন অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। একদিনের শপথ, একদিনের আবেগ, একদিনের সহানুভূতি—এরপর আবার সেই পুরনো বাস্তবতায় ফিরে যাওয়া। শ্রমিকের জীবন যেন এক অন্তহীন প্রতিশ্রুতির প্রতারণা।
এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন—এখনই, জরুরি ভিত্তিতে।
শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তব নীতিমালায় শ্রমিকবান্ধব পরিবর্তন আনতে হবে।
ন্যায্য মজুরি, ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের কঠোর বাস্তবায়ন, ঠিকাদারি শোষণের অবসান, সামাজিক নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
নচেৎ, প্রতি বছর মে দিবস আসবে, শ্লোগান উঠবে, মিছিল হবে—কিন্তু শ্রমিকের জীবন অন্ধকারেই রয়ে যাবে।
শ্রমিকের জন্য নয়, শ্রমিককে সঙ্গে নিয়েই একটি ন্যায্য সমাজ গড়ার সময় এখনই।
(লেখকঃ টিইউসি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক)
