‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে সিপিবির কার্যালয়ের সামনে হামলার অভিযোগ
পুরানা পল্টনে নেতা-কর্মীদের মারধর, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ঢাকা: সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করতে গিয়ে আটক ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর বিক্ষোভ মিছিল বের করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা-কর্মীরা। ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজধানীর পুরানা পল্টনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দিয়ে একদল ব্যক্তি এ হামলা চালান।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে হামলা শুরু হয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে হামলাকারীরা সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় সিপিবির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধর করা হয় বলে দলটির নেতারা জানান। পরে পুলিশ এসে তাঁদের উদ্ধার করে।
সিপিবির নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপক শীলের মুক্তির পর তাঁকে নিয়ে দলটির নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিল বের করেন। মিছিলটি পল্টন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দেওয়া হয়। এ সময় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দেওয়া ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি তোলেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।
একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিরা ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’ স্লোগান দেন। কিছুক্ষণ পর তাঁরা সিপিবির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে সিপিবির নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ফিরে এলে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করে বিভিন্ন স্লোগান দেন। রাত ১১টার পর তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।
সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখার পরও তাঁদের ওপর হামলা করা হয়েছে। সরকারকে নিজের দলের লোকজনকে সামলাতে হবে। একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের সামনে এসে কীভাবে হামলা চালানো হয়, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
হামলার পর সিপিবির সদস্য ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন জলি তালুকদার। তবে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দীপক শীলের মুক্তির পর ১৫ থেকে ২০ জন পল্টন এলাকায় একটি মিছিল বের করেন। ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় কিছু লোক অভিযোগ তোলেন। পরে তাঁদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। সিপিবির কার্যালয় ভাঙচুর বা কাউকে আটক করার ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, সিপিবির কার্যালয়ে ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী বিক্ষোভ দেখাতে গেছেন, এমন কোনো ঘটনার বিষয়ে তাঁরা অবগত নন। এ ধরনের কোনো নির্দেশনাও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
রাত সোয়া ১২টার দিকে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঘোষণা দিয়ে তাঁদের পার্টি অফিসে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে থাকা ব্যক্তিরা ওই চেষ্টা করেছিলেন, তবে সিপিবির নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধে তাঁরা সফল হননি। এবারের হামলার মধ্য দিয়ে সেই ব্যর্থতার আক্রোশ মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাঁদের মনে হচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সিপিবির ভূমিকার কথা তুলে ধরে আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই কারফিউ ভেঙে তাঁরা ঢাকার রাজপথে মিছিল করেছিলেন এবং ২ আগস্ট দ্রোহযাত্রা করেছিলেন। অথচ এখন তাঁদের ফ্যাসিস্ট ও পতিত সরকারের দোসর বলা হচ্ছে। এসব অভিযোগ তুলে কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিপিবির কার্যালয়ে অতীতের হামলার ঘটনাও তুলে ধরেন দলটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, এরশাদের আমলে তাঁদের কার্যালয়ে হামলা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ৫ মে গানপাউডার দিয়ে পার্টি অফিসের তিনতলা পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে ২৩ বছর তাঁদের দল নিষিদ্ধ ছিল এবং ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানও দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
হামলাকারীদের উদ্দেশে আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, গভীর রাতে হামলা করতে এলেও সিপিবির নেতা-কর্মীরা নিজ নিজ এলাকা থেকে এসে পার্টি অফিস রক্ষা করেছেন। জীবন দিলেও কমিউনিস্ট পার্টির ওপর কোনো আক্রমণ বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। মব তৈরি করে মাজার ভাঙা, পত্রিকা অফিস পোড়ানো ও পার্টি অফিস ভাঙার মতো ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষতি করা যাবে না।
হামলার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীপক শীলের মুক্তির পর একটি মিছিল হয়েছিল বলে তাঁরা শুনেছেন। সেই মিছিলে ‘জয় সমাজতন্ত্র’ ও ‘জয় সর্বহারা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। হামলাকারীরা স্লোগানগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করে হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। তবে কোনো স্লোগানই পার্টি অফিসে হামলার অজুহাত হতে পারে না।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান প্রসঙ্গে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। আওয়ামী লীগ এই স্লোগান দিয়ে অন্যায় করেছে বলে তাঁরা স্লোগানটি ছেড়ে দেবেন, এমন নয়। কেউ মিছিল থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে থাকলেও তা পার্টি অফিসে হামলার অজুহাত হতে পারে না।
হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, তাঁরা নিজেদের একটি দলের লোক বলে পরিচয় দিয়েছেন। তবে সেই পরিচয় সত্য কি না, তা নিশ্চিত নয়। স্থানীয় সরকারদলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা হামলাকারীদের নিজেদের দলের লোক নন বলে জানিয়েছেন।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আরও জানান, হামলার বিষয়ে তাঁরা সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করবেন। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।