চৌধুরী হারুন অর রশীদ ত্যাগ, আদর্শ ও সংগ্রামের প্রতীক

মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতি এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে চৌধুরী হারুন অর রশীদের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনরা। তাঁরা বলেন, চৌধুরী হারুন অর রশীদ ছিলেন ত্যাগ, আদর্শ ও সংগ্রামের প্রতীক। ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও কল্যাণই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।
আজ শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ মিলনায়তনে জননেতা চৌধুরী হারুন অর রশীদের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত স্মারক-প্রবন্ধ পাঠ ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘চৌধুরী হারুন অর রশীদ জন্মশতবর্ষ উদযাপন পরিষদ’ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সংগীত পরিবেশন করে। এরপর চৌধুরী হারুন অর রশীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চৌধুরী হারুন অর রশীদ জন্মশতবর্ষ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক রণজিৎ দে। স্মারকপ্রবন্ধ পাঠ করেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক কমরেড কানাই দাশ।
বক্তব্য দেন কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলা কমান্ডার, সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি কমরেড মো. শাহ আলম, গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, টি ইউ সি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, শ্রমিক নেতা কমরেড মৃণাল চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা বালাগাত উল্লাহ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলা কমান্ডার উদয়ন নাগ, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি অশোক সাহা, টি ইউ সি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মসিউদদৌলা, ন্যাপ নেতা গাজী আলমগীর, বাসদ নেতা আল কাদেরী জয়, চট্টগ্রাম জেলা যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাবেদ চৌধুরী ও ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি শুভ দেবনাথ। সঞ্চালনা করেন সিপিবির দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী ও শ্রমিক নেতা ফজলুল কবির মিন্টু।

বক্তারা বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই চৌধুরী হারুন অর রশীদ রাজনীতিতে যুক্ত হন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে। দীর্ঘ চার বছর বিনা বিচারে কারাভোগ করেও তিনি আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, গণ-আন্দোলন সংগঠিত করা এবং শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁরা আরও বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনীর যুগ্ম কমান্ডার হিসেবে চৌধুরী হারুন অর রশীদ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ রেল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে তিনি দেশের শ্রমিক আন্দোলনকে সংগঠিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনেও বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার তুলে ধরেছেন তিনি।
বক্তারা বলেন, চৌধুরী হারুন অর রশীদের রাজনৈতিক জীবন ছিল আপসহীন সংগ্রাম, নীতিনিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কারাবরণ, আত্মগোপন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও অসুস্থতা কোনো কিছুই তাঁকে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। তাঁর মতো ত্যাগী ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতিকের জীবন থেকে বর্তমান প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে।
উল্লেখ্য, চৌধুরী হারুন অর রশীদ ১৯২৬ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার মনসা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে পটিয়া আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০০০ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।