যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–২৫: ফজলুল কবির মিন্টু

চাকরিতে ফিরতে গিয়ে পদত্যাগ, পাওনা আদায়ে আরেক লড়াই
শেফালী আক্তারের গল্প
২০১৮ সালের কথা। শেফালী আক্তার চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত প্রগ্রেসিভ এপারেলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কোয়ালিটি সেকশনে কাজ করতেন। ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দিয়েছিলেন। কাজ করেই চলছিল তাঁর জীবন-জীবিকা। কিন্তু অসুস্থতা একসময় তাঁকে কর্মস্থল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর সেই অসুস্থতাই হয়ে ওঠে তাঁর চাকরি হারানোর কারণ।
২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর অসুস্থ বোধ করায় শেফালী কাজে যোগ দিতে পারেননি। পরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে চার সপ্তাহ বিশ্রামে থাকতে হয়। বিষয়টি লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো না হলেও তিনি মৌখিকভাবে তাঁর সুপারভাইজারকে জানিয়েছিলেন। সুপারভাইজারও তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে কাজে ফেরার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ হয়ে ৩ নভেম্বর শেফালী আবার কাজে যোগ দিতে গেলেন। কিন্তু কর্মস্থলে ফিরে পেলেন না তাঁর পরিচিত কাজের জায়গা। কর্তৃপক্ষ তাঁকে কাজে যোগ দিতে বাধা দিল।
কেন? অসুস্থতার কারণে কয়েক সপ্তাহ অনুপস্থিত থাকার অপরাধে কি একজন শ্রমিকের চাকরি কেড়ে নেওয়া যায়? শেফালীর কাছে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না। ছিল শুধু কাজ ফিরে পাওয়ার আকুতি।
তিনি হাল ছাড়লেন না।
পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফের সহযোগিতায় ১০ নভেম্বর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করলেন। তাঁকে কাজে যোগদানের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেল না।
পরদিন, ১১ নভেম্বর, শেফালী লিখিত অভিযোগ জানালেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে, উপমহাপরিদর্শক বরাবর।
এবার কর্তৃপক্ষের টনক নড়ল। শেফালীর তৎপরতা বুঝতে পেরে ১৮ নভেম্বর তাঁকে ডেকে পাঠানো হলো। কিন্তু চাকরিতে যোগদানের সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হলো অন্য এক পরিণতি—তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হলো পদত্যাগপত্র।
যে শ্রমিক অসুস্থতা কাটিয়ে নিজের কর্মস্থলে ফিরতে চেয়েছিলেন, তাঁকেই শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কাগজে স্বাক্ষর করতে হলো।
এরপর কর্তৃপক্ষ তাঁর চূড়ান্ত হিসাবের টাকা বাবদ ১৭ হাজার টাকা ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে জমা করে। শেফালী ভেবেছিলেন, অন্তত তাঁর পাওনা টাকাটুকু বুঝি পাওয়া গেল। কিন্তু সেখানেও অপেক্ষা করছিল আরেক বিপত্তি।
টাকা জমা হওয়ার এক দিন পর তা তুলতে গিয়ে তিনি জানতে পারলেন, তাঁর সিমটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে নিজের নামে জমা হওয়া টাকাও তিনি তুলতে পারছিলেন না। বিষয়টি প্রগ্রেসিভ এপারেলস কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে সহযোগিতা চাইলেন। কিন্তু সেখান থেকেও কোনো সহায়তা পেলেন না।
একদিকে চাকরি নেই, অন্যদিকে নিজের পাওনা টাকা তুলতে না পারার অসহায়তা। শেফালী আবারও অভিযোগ জানালেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে।
অবশেষে ৪ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অধিদপ্তরের কার্যালয়ে মালিকপক্ষের উপস্থিতিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হলো। শুনানিতে পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের উপদেষ্টা ফজলুল কবির মিন্টু শেফালীর পাওনার হিসাব পর্যালোচনা করে দেখালেন, কর্তৃপক্ষ যে ১৭ হাজার টাকা দিয়েছে বলে দাবি করছে, সেটিই তাঁর প্রকৃত পাওনা নয়। আইন অনুযায়ী হিসাব করলে শেফালী আরও অনেক বেশি টাকা পাওয়ার অধিকারী।
পুনরায় হিসাব-নিকাশের পর তাঁর পাওনা নির্ধারণ করা হলো ৩২ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ আগের হিসাবের চেয়ে আরও ১৫ হাজার ২০০ টাকা বেশি। সিদ্ধান্ত হলো, আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে শেফালীকে এই টাকা পরিশোধ করতে হবে।
এভাবেই শেফালীকে তাঁর ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করার প্রচেষ্টা প্রতিহত করা সম্ভব হলো।
শেফালীর ঘটনাটি নিছক একজন শ্রমিকের পাওনা টাকা আদায়ের গল্প নয়। এটি অসুস্থ হয়ে পড়া একজন শ্রমিকের চাকরিতে ফিরে যাওয়ার আকুতি, কর্মস্থলে তাঁর অসহায়ত্ব, পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং নিজের অধিকার আদায়ে একের পর এক দরজায় কড়া নাড়ার গল্প। একই সঙ্গে এটি দেখায়, শ্রমিকের পাশে ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রম অধিকারকর্মীরা দাঁড়ালে অন্যায়ভাবে কমিয়ে দেওয়া পাওনার হিসাবও সংশোধন করা সম্ভব।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতজন শেফালীর পক্ষে এভাবে দাঁড়ানো সম্ভব?
কদাচিৎ সৌভাগ্যক্রমে একজন বা দুজন শেফালীকে হয়তো বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করা যায়। কিন্তু অসংখ্য শেফালী প্রতিদিন নীরবে তাঁদের চাকরি, মজুরি, ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সবাই অভিযোগ জানাতে পারেন না, সবাই শ্রমিকনেতার সহযোগিতা পান না, সবাই নিজের অধিকারের হিসাব বুঝে উঠতে পারেন না।
তাই একজন শেফালীর পাওনা আদায় করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। প্রয়োজন এমন একটি শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, যা প্রতিটি শ্রমিকের পাশে দাঁড়াবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং শ্রমিককে তাঁর অধিকার সম্পর্কে সচেতন ও সংগঠিত করবে।
কারণ, বিচ্ছিন্নভাবে একজন শেফালীকে বাঁচানো যায়; কিন্তু সব শেফালীকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন সংগঠিত শ্রমিকশক্তি।
একজন শেফালীর লড়াই আমাদের শেখায়—অধিকার ভিক্ষা করে নয়, সংগঠিত শক্তিতে আদায় করতে হয়।