যে গল্পগুলো লেখা হয়নি-১১: ফজলুল কবির মিন্টু
অবশেষে সানজিদা তার পাওনা টাকা পেল
![]()
ঘটনাকালঃ মার্চ ২০২৩
কিছু গল্প খুব ছোট।
কাগজে লিখলে হয়তো কয়েকটি লাইনের বেশি হবে না। কিন্তু সেই কয়েকটি লাইনের পেছনে লুকিয়ে থাকে একজন মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা, অভিমান, হতাশা আর এক বুক আশার গল্প।
সানজিদার গল্পটাও তেমনই।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সানজিদা চাকরি থেকে রিজাইন করেছিল। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর তার পাওনা টাকা পাওয়ার কথা। খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। একজন শ্রমিক বা কর্মচারী চাকরি শেষ করবে, আর তার আইনসংগত পাওনা বুঝে নেবে—এটাই তো হওয়ার কথা।
কিন্তু বাস্তবতা সব সময় এত সহজ হয় না।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সানজিদাকে জানানো হলো—রিজাইনের টাকা দেওয়া হয় না।
কথাটা শুনে সানজিদা আমাদের কাছে আসে। তার চোখে ছিল অনিশ্চয়তা, কথায় ছিল হতাশা। হয়তো মনে মনে সে ভাবছিল—চাকরি করেছি, শ্রম দিয়েছি, তারপরও কি আমার পাওনা টাকা পাব না?
আমরা বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারিনি।
চট্টগ্রাম যুব ট্রেড ইউনিয়ন নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করলাম। একবার নয়, দুইবার। আমরা বোঝানোর চেষ্টা করলাম—একজন শ্রমিকের পাওনা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তার অধিকার।
আলোচনা হলো। আশ্বাস এলো। কর্তৃপক্ষ টাকা দেওয়ার কমিটমেন্ট করল।
আমরাও আশাবাদী হলাম।
সানজিদাকেও বললাম,
“অপেক্ষা করো। এবার হয়তো হয়ে যাবে।”
কিন্তু হলো না।
প্রতিশ্রুতির সময় পেরিয়ে গেল। টাকা এলো না। আবারও অপেক্ষা। আবারও হতাশা। কর্তৃপক্ষের দেওয়া কমিটমেন্টও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলো।
একসময় মনে হলো, সানজিদার হয়তো বিশ্বাসটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর আমাদেরও ভেতরে ভেতরে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। একজন শ্রমিককে আমরা আশ্বস্ত করেছি—তার পাওনা আদায়ের চেষ্টা করছি। অথচ সময় যাচ্ছে, কিন্তু সমাধান হচ্ছে না।
তবুও আমরা হাল ছাড়িনি।
সানজিদাকে বললাম,
“ধৈর্য ধরো। আমরা চেষ্টা করছি।”
কখনো কখনো শ্রমিকের লড়াইয়ে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো তাকে আশাবাদী রাখা। কারণ তার কাছে প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। তার সংসার আছে, প্রয়োজন আছে, খরচ আছে। পাওনা টাকা তার কাছে শুধু একটি অঙ্ক নয়—তার জীবনের প্রয়োজন।
আমরাও তখন সম্ভাব্য সব পথ খুঁজছিলাম।
এই প্রক্রিয়ায় আইএলও’র বেটার ওয়ার্ক বাংলাদেশের আতিক ভাই ও নাহার আপার সহযোগিতা পাই। তারাও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের সহযোগিতা আমাদের এই প্রচেষ্টাকে অনেক বেশি কার্যকর করেছে।
তারপর কেটে গেছে আরও কিছু সময়।
আজ হঠাৎ সানজিদার কাছ থেকে খবর এলো—
“ভাই, আমাকে চেক দিয়েছে।”
চেকের অঙ্ক—২৫ হাজার ৫০০ টাকা।
খবরটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
মনে হলো, এই ২৫ হাজার ৫০০ টাকা শুধু একটি চেকের অঙ্ক নয়। এর মধ্যে আছে গত এক বছরের অপেক্ষা। আছে হতাশার দিনগুলো। আছে বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতির স্মৃতি। আছে একজন শ্রমিকের ধৈর্য। আর আছে শেষ পর্যন্ত ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার স্বস্তি।
আমার হিসাব অনুযায়ী, শ্রম আইন অনুসারে সানজিদা তার সম্পূর্ণ পাওনা পেয়েছে।
হয়তো এই টাকা দিয়ে তার অনেক বড় কোনো স্বপ্ন পূরণ হবে না। কিন্তু পাওনা টাকা হাতে পাওয়ার যে স্বস্তি—সেটার মূল্য অন্য কোনো অঙ্কে মাপা যায় না।
একজন শ্রমিক যখন তার প্রাপ্য টাকা হাতে নেয়, তখন শুধু তার পকেট ভারী হয় না; তার আত্মমর্যাদাটাও একটু শক্ত হয়।
সানজিদার ক্ষেত্রেও আজ সেটাই হয়েছে।
আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই আইএলও’র বেটার ওয়ার্ক বাংলাদেশের আতিক ভাই ও নাহার আপাকে। তাদের সহযোগিতা না থাকলে হয়তো এই টাকা পাওয়া এত সহজ হতো না।
আমাদের পথটা কখনো সহজ নয়।
আমরা যখন কোনো শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায়ের লড়াইয়ে নামি, তখন জানি না শেষ পর্যন্ত কতটা পথ হাঁটতে হবে। কখনো আলোচনা, কখনো বৈঠক, কখনো অনুরোধ, কখনো চাপ—সম্ভাব্য সব বৈধ পথই আমাদের ব্যবহার করতে হয়।
কারণ আমরা জানি, শ্রমিকের পাওনা মানে শুধু টাকা নয়।
এটা তার শ্রমের মূল্য।
তার সময়ের মূল্য।
তার ঘামের মূল্য।
তার অধিকার।
তার মর্যাদা।
আল্লাহর অশেষ রহমতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সফল হই।
এবারও হলাম।
সানজিদার হাতে যখন ২৫ হাজার ৫০০ টাকার চেক পৌঁছেছে, তখন মনে হলো—আরেকটি ছোট গল্পের শেষ হলো।
কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই গল্পের শেষ এখানেই নয়।
কারণ সানজিদার মতো আরও অনেক সানজিদা আছে।
যাদের পাওনা আটকে আছে।
যাদের কণ্ঠস্বর দুর্বল।
যারা একসময় হতাশ হয়ে ভাবতে শুরু করে—“আমার জন্য কি কেউ দাঁড়াবে?”
আমরা তাদের বলতে চাই—
হ্যাঁ, কেউ না কেউ দাঁড়াবে।
ন্যায্য অধিকারের লড়াইয়ে কেউ একা নয়।
শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায়ে কোনো ছাড় নেই।
লড়াই চলবে।