এনসিটি-সিসিটি ইজারা বাতিলের দাবিতে বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম এর অবস্থান কর্মসূচী

-১৩ অক্টোবর বন্দর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম। ৫ অক্টোবর সোমবার সকাল ১১টা থেকে বন্দর ভবনের সামনের সড়কে এ কর্মসূচি শুরু হয়। পরে জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দুপুর ১টায় কর্মসূচি শেষ করা হয়।

অবস্থান কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি ও বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক তপন দত্ত। সঞ্চালনা করেন বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু।

এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদনের প্রক্রিয়া এবং এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের সবচেয়ে লাভজনক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া জাতীয় অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌম স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অবস্থান কর্মসূচিতে সভাপতির বক্তব্যে তপন দত্ত বলেন, “ক্ষমতায় এসেই যদি আপনারা শ্রমিকের বিরুদ্ধে যান, বন্দর দিতে শুরু করেন, এনসিটি দিতে শুরু করেন, তখন আমাদের কষ্ট হয়। এই এনসিটির টাকা দিয়ে পায়রা হয়, বে টার্মিনাল হয়, মাতারবাড়ি হয়, পানগাঁও হয়। এটা তো দুধেল গাই। এটা কেন কেটে খাব আমরা।”

তিনি বলেন, “আমরা চাই না বন্দর, এনসিটি, সিসিটি বিদেশিদের হাতে দেওয়া হোক। এই দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি। এর আগের সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারও আমাদের আন্দোলনের কথা শুনতে বাধ্য হয়েছে। এবারও আমরা এমন আন্দোলন গড়ে তুলব, যেখানে জনগণ আমাদের সঙ্গে থাকবে। জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে দিতে পারি না।”

ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবের সমালোচনা করে তপন দত্ত বলেন, প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন দেশে পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে লাভজনক এনসিটি কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হবে—এটাই তাদের মূল প্রশ্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

শ্রমিকনেতা কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যান ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্বার্থে কাজ করছেন বলে তাদের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, “বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন।” তিনি বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের চলমান আন্দোলন কোনোভাবেই সরকারের বিরুদ্ধে নয়। যারা সরকারকে ভুল বুঝিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করছে, আমাদের আন্দোলন তাদের বিরুদ্ধে।”

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন বলেন, আগামী ৮ অক্টোবর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি হতে পারে বলে তারা শুনেছেন। তিনি বলেন, “যদি তাই হয়, তাহলে চুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে”—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি সরকারকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

বক্তারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশীয় ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকদের অবদান রয়েছে। তাই কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার আগে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি, কর্মসংস্থান, শ্রমিক অধিকার এবং বন্দরের কৌশলগত নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অপর যুগ্ম সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির  বলেন, সম্প্রতি কিছু ব্যক্তি ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বন্দর ইজারা দেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বন্দর পরিচালনা ও এর বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে না জেনে কেবল বিদেশি বিনিয়োগের যুক্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ইজারা দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন বলেন, “একসময় এই বন্দর ছিল ভাঙাচোরা অবস্থায়। এখানে শেয়াল-কুকুরের বসবাস ছিল, ছিল বন-জঙ্গল। শ্রমিকদের শ্রম, ঘাম ও জীবন-যৌবনের বিনিময়ে আজ চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিক ও কর্মচঞ্চল বন্দরে পরিণত হয়েছে। এই বন্দরের আধুনিকায়নের পেছনে আমাদের শ্রমিকদের অবদান ও ত্যাগ জড়িয়ে আছে। অথচ কিছুসংখ্যক দালাল মিলে বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেবে—এটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না।”

তিনি আরও বলেন, “বন্দর বিদেশি অপারেটরের হাতে চলে গেলে শ্রমিকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই শ্রমিকের স্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থে বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।”

অবস্থান কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন, বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন ও হুমায়ুন কবির, ডক শ্রমিক দলের মো. হারুন, ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অশোক সাহা, বাসদ মার্ক্সবাদী চট্টগ্রাম জেলাত সমন্বয়ক শফিউদ্দিন কবির আবিদ, গণ্মুক্তি ইউনিয়নের সম্বয়ক রাজা মিয়া, স্কপ চট্টগ্রামের যুগ্ম সমন্বয়ক রবিউল হক শিমুল, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, চট্টগ্রাম যুব ট্রেড ইউনিয়ন নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব হাসিবুর রহমান বিপ্লব, ল্যাসিং-আনল্যাসিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. ইকবাল, মার্চেন্ট শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নূর হোসেন, উইঞ্চ অপারেটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ইমাম হোসেন খোকনসহ বিভিন্ন শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা।

অবস্থান কর্মসূচীতে আরো উপস্থিত ছিলেন, বিএফটিইউসির যুগ্ম সম্পাদক রিজওয়ানুর রহমান খান, বিএলেফ মহানগর কমিটির সভাপতি নুরুল আবসার তৌহিদ, বেসরকারী স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রহিম, যুব ট্রেড ইউনিয়ন নেট ওয়ার্কের আহ্বায়ক আবু আহমেদ মিয়া, জান্নাতুল ফেরদৌ্‌স, ইমারত নির্মান শ্রমিক ইউনিয়ন – ইনসাব চট্টগ্রাম জেলার সাধারন সম্পাদক মহিন উদ্দিন, হাল্কা মোটর যান শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি   প্রমুখ

বক্তারা এনসিটি ও সিসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিল, বিদেশি অপারেটরের কাছে বন্দর হস্তান্তরের উদ্যোগ বন্ধ এবং বন্দরের স্বার্থবিরোধী যেকোনো সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

অবস্থান কর্মসূচির শেষে সভাপতির বক্তব্যে তপন দত্ত আগামী ১৩ অক্টোবর সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বন্দর রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং সর্বস্তরের জনগণকে ওই কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানান।