যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–১২
শ্রমিককে বের করে দিলেই শেষ নয়, পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার দিনও এসেছে
![]()
ঘটনাকাল: মার্চ ২০২৩
জাহেদ সিএসসিআর হাসপাতালের ক্যান্টিনে বাবুর্চির কাজ করতেন। নিয়মিত কাজ করতেন, শ্রম দিতেন। কিন্তু ২০২২ সালের অক্টোবরে একদিন হঠাৎ তাকে জানিয়ে দেওয়া হলো—তার আর কাজে আসার প্রয়োজন নেই।
কোনো নোটিশ নেই। কোনো ক্ষতিপূরণ নেই। এমনকি কেন তাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হলো, তারও কোনো লিখিত ব্যাখ্যা নেই।
অভিযোগ ছিল—জাহেদ নাকি মালিকের কথা শুনতেন না।
কিন্তু প্রশ্ন উঠল, একজন শ্রমিক মালিকের কোনো কথা না শুনলে কি তাকে মৌখিক নির্দেশে, কোনো নোটিশ বা আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই চাকরি থেকে বের করে দেওয়া যায়?
উত্তরটা খুবই পরিষ্কার—না।
এরপর শুরু হলো আরেক গল্প।
সিএসসিআর কর্তৃপক্ষ বলতে শুরু করল, ক্যান্টিনটি তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান নয়। তারা ক্যান্টিনটি তৃতীয় পক্ষকে ভাড়া দিয়েছে। অর্থাৎ জাহেদ সিএসসিআরের শ্রমিক নন।
কিন্তু জাহেদের হাতে ছিল সিএসসিআর হাসপাতালের পরিচয়পত্র।
সেই পরিচয়পত্রকে কর্তৃপক্ষ জাল বলেও দাবি করল।
একদিকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে শ্রমিকের পরিচয় নিয়েই তৈরি হলো নতুন প্রশ্ন।
আলোচনায় কোনোভাবেই বিষয়টির যৌক্তিক সমাধান হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ক্যান্টিনের মালিককেও আলোচনায় আনা হলো। তিনি এসে বললেন, তিনি তো সাধারণ মানুষ—শ্রম আইন বোঝেন না।
কথাটা হয়তো সত্যিই হতে পারে। কিন্তু শ্রম আইন না জানা থাকলেই তো শ্রমিকের অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
জাহেদের কাছে কোনো নিয়োগপত্র ছিল না। কিন্তু তার হাতে ছিল সিএসসিআর হাসপাতালের পরিচয়পত্র। কাজও করতেন সিএসসিআর হাসপাতালের ক্যান্টিনে। ফলে তার কর্মপরিচয় ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নে বিষয়টি আর এত সহজে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।
আলোচনা, যুক্তি আর অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় অবশেষে বিষয়টি গড়াল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে।
১৪ আগস্ট ২০২৩ দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পর দীর্ঘদিনের বিরোধের একটি সমাধান হলো।
জাহেদের পাওনা ৫০ হাজার টাকায় নিষ্পত্তি হলো।
একজন শ্রমিকের জন্য হয়তো ৫০ হাজার টাকা খুব বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু এই ৫০ হাজার টাকার ভেতরে ছিল তার শ্রমের মূল্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—
শ্রমিককে ইচ্ছেমতো চাকরি থেকে বের করে দিলেই তার পাওনা শেষ হয়ে যায় না।
জাহেদ তার প্রাপ্য টাকা বুঝে নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। আর এই ঘটনাটি হয়তো আরও অনেক শ্রমিকের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে রইল।
সিএসসিআর হাসপাতাল ক্যান্টিনের কর্তৃপক্ষ এতদিন হয়তো শ্রম আইন ভালোভাবে জানতেন না। কিন্তু জাহেদের ঘটনাটি তাদেরও একটি বিষয় বুঝিয়ে দিল—
শ্রমিককে চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার আগে আইন জানতে হয়, আর শ্রমিককে বের করে দিলে তার আইনগত পাওনাও পরিশোধ করতে হয়।
একজন জাহেদের পাওনা আদায় মানে শুধু একজন শ্রমিকের হাতে টাকা তুলে দেওয়া নয়। এর মধ্য দিয়ে আরও অনেক জাহেদকে বলা—
অন্যায়ভাবে চাকরি হারালেও চুপ করে থাকতে হবে না। অধিকার চাইতে হবে, আইনের আশ্রয় নিতে হবে।
এই ছোট্ট জয়গুলোই একদিন বড় পরিবর্তনের গল্প হয়ে ওঠে।
আর সেই কারণেই—
এই গল্পটিও লেখা দরকার ছিল।