চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ৯ হাজারের বেশি, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ছাড়িয়েছে। সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৮৭৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭৪৩ জন। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ২৬ জন এবং নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে চিকিৎসকদের মতে, হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের সবার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হাম ব্লকে উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর চাপ রয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়ায় বেড সংকটও দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক হামের উপসর্গযুক্ত শিশুকে সাধারণ ওয়ার্ডে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যেও হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

চিকিৎসকরা জানান, এমন অনেক শিশুও হাসপাতালে পাওয়া যাচ্ছে, যারা অন্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিল। চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর আবার হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। হামের রোগীদের জন্য পৃথক ডেডিকেটেড হাসপাতাল বা চিকিৎসা ব্যবস্থা করা গেলে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চিকিৎসকদের তথ্যমতে, হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশুর বয়স দুই বছরের কম। এর মধ্যে অনেকের এখনো হাম প্রতিরোধী টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। আবার কেউ টিকা নেয়নি, কেউ একটি ডোজ নিয়েছে, আবার কেউ দুই ডোজ নেওয়ার পরও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি-হাঁচির মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি জটিল আকার ধারণ করলে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো টিকা গ্রহণই হাম প্রতিরোধের প্রধান উপায়। পাশাপাশি শিশুদের অপুষ্টি রোধ এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ পান এবং পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক।

চিকিৎসকদের মতে, হাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। অধিকাংশ শিশু যথাযথ চিকিৎসা ও পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে হাম ছোঁয়াচে হওয়ায় আক্রান্ত রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া জরুরি।

অভিভাবকদের সতর্ক করে চিকিৎসকরা বলেন, কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে কফ, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে র‌্যাশ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। বাসায় রেখে চিকিৎসা করতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ করলে রোগটি জটিল হয়ে নিউমোনিয়াসহ গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে সম্প্রতি চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায়ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। সাধারণত ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয়। অর্থাৎ আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমিত হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের বয়স ছিল দুই মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত।

গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত এলাকার এবং ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবারের। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩১ শতাংশ তীব্র বা একিউট পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল।

টিকা না নেওয়ার কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, টিকাবিহীন শিশুদের ৫২ শতাংশের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০ শতাংশ শিশু অসুস্থ থাকার কারণে, ৮ শতাংশ মায়ের অসুস্থতার কারণে, ৪ শতাংশ টিকার ভয় এবং আরও ৪ শতাংশ টিকা কার্ড হারিয়ে ফেলায় টিকা নেয়নি।

চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বলেন, “হামের পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনো হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হচ্ছে। আমাদের হাসপাতালে আসা অনেক শিশু টিকা নেয়নি। আবার কিছু শিশুর টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। কিছু শিশু এক ডোজ টিকা নিয়ে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি। আবার দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে এমন শিশুও আছে। হামের রোগীদের আমরা আলাদা করে চিকিৎসা দিচ্ছি।”

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, “আমরা হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের আলাদাভাবে চিকিৎসা দিচ্ছি। নির্ধারিত সংখ্যার রোগীর চাপ বাড়ছে, এটি ঠিক। তবে আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করছি।”

চিকিৎসকদের পরামর্শ, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি যথাসময়ে সম্পন্ন করার পাশাপাশি হাম সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রেখে চিকিৎসা দেওয়া গেলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।