চলমান সংবাদ

টানা চার দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম বিপর্যস্ত, ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী বর্ষণের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগরী। এই সময়ে নগরে রেকর্ড হয়েছে ৮৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। ভারী বৃষ্টির কারণে নগরের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, পাহাড়ধসে প্রাণ গেছে এক শিশুর এবং আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত একই ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকির সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারে ১৯৪ মিলিমিটার এবং পাহাড়তলীর আমবাগান পর্যবেক্ষণাগারে দেশের সর্বোচ্চ ২৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ভোর ৬টা পর্যন্ত একই সময়ে পতেঙ্গায় ২৮৪ মিলিমিটার এবং আমবাগানে ২৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। একই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ ৩১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বান্দরবানে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত তিন দিনে চট্টগ্রামে ৬৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিমের তথ্যমতে, গত চার দিনে চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গা স্টেশনে মোট ৮৩৪ মিলিমিটার এবং আমবাগান স্টেশনে ৭৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

জলাবদ্ধতায় নগরজীবন অচল

অবিরাম বর্ষণের ফলে বুধবারও নগরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অনেক সড়কে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। পানি ঢুকে পড়ে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। এমনকি অতীতে জলাবদ্ধতা না হওয়া কয়েকটি এলাকাতেও এবার পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। তবে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশ এলাকার পানি নেমে যায়।

হালিশহর, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, রেয়াজুদ্দিন বাজার, বড় দিঘীরপাড়, বেপারীপাড়া, মুহুরীপাড়া, মুরাদপুর, সিএন্ডবি, মনসুরাবাদ, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, কাপাসগোলা, পাঁচলাইশ, সিডিএ আবাসিক এলাকা, জুবিলী রোড, তিনপোলের মাথা, গোয়ালপাড়া, ষোলশহর ফরেস্ট গেট, মৌলভীপুকুরপাড় ও ঈদগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি জলমগ্ন সড়কে নৌকা চলাচলের ভিডিওও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, জলাবদ্ধতার পাশাপাশি বৃষ্টিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশাচালক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন।

পাহাড়ধসে শিশুর মৃত্যু

অবিরাম বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। বুধবার নগরে পাহাড়ধসের ঘটনায় ১২ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পড়ুন:  চট্টগ্রামে ১৫টি সিবিওর মাঝে ১৮ লাখ ৯১ হাজার টাকার অনুদান বিতরণ

পরিদর্শনে সিডিএ চেয়ারম্যান

জলাবদ্ধ এলাকা ও চলমান উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। তিনি বলেন, নালা-নর্দমা পরিষ্কার করা সিডিএর দায়িত্ব নয়; তাদের মূল দায়িত্ব অবকাঠামো উন্নয়ন। অতীতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এই দায়িত্ব সিডিএকে দেওয়া হলেও এ ধরনের কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তাদের নেই।

তিনি জানান, বিভিন্ন রেগুলেটরের সবগুলো এখনও সচল নয়। বুধবার বিকেল থেকে এসব রেগুলেটরের দায়িত্ব সেনাবাহিনী গ্রহণ করেছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে রেগুলেটর বা পাম্প অচল থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস

আবহাওয়া অধিদপ্তর মঙ্গলবার রাতের বিশেষ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ভারতের উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৯ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময়ে ২০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

একই সতর্কবার্তায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৭, ৮, ৯ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ড, বাঁশখালী উপজেলা, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফ, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও সদর উপজেলা, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়িকে ভূমিধসের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বলেন, ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

সমুদ্র ও নদীবন্দরে সতর্কতা

বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত এবং চট্টগ্রাম নদীবন্দরের জন্য ২ নম্বর নৌ-সতর্কতা সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি ধীরে ধীরে দুর্বল হলেও এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য বজায় রয়েছে। ফলে সমুদ্রবন্দর, উপকূলীয় অঞ্চল এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।