যে গল্পগুলো লেখা হয়নি- ৯ -ফজলুল কবির মিন্টু
ঘটনাকালঃ মে, ২০২৩
পাওনা আদায়ের জন্য অবশেষে শিল্প পুলিশের দরজায়
বকুল আর মোমেনা—দুজনই পোশাকশ্রমিক। চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানাধীন বালুছড়ার ওয়েলকাম ফ্যাশন নামের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন তারা। প্রতিদিনের মতো শ্রম দিয়ে মজুরি পাওয়ার কথা ছিল তাদের। কিন্তু সেই মজুরিই একসময় তাদের কাছে হয়ে উঠল অনিশ্চিত পাওনা।
দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস পেরিয়ে যায়—কিন্তু বকুল ও মোমেনার বকেয়া মজুরি আর পরিশোধ হয় না। সংসারের প্রয়োজন, নিত্যদিনের খরচ আর জীবনের নানা দায় সামলাতে গিয়ে দুই শ্রমিক শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে শুরু করেন।
প্রায় তিন মাস আগে তারা বিষয়টি জানান কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে। অভিযোগের পর একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বৈঠকে মালিকপক্ষ উপস্থিত হয়নি। এরপর যেন থেমে গেল সবকিছু। শ্রমিকদের অভিযোগের পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে আর কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ল না।
বকুল-মোমেনার সামনে তখন প্রশ্ন—তারা যাবেন কোথায়?
অবশেষে পাওনা মজুরি আদায়ের দাবিতে শিল্প পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তাদের পক্ষে শিল্প পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। শিল্প পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। শ্রমিকদের পাওনা আদায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া যায়। মূলত তাঁদের পরামর্শেই অভিযোগটি করা হয়েছিল।
সেদিন মনে হয়েছিল, শ্রমিকের লড়াই হয়তো নতুন একটি দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু লড়াই সেখানেই শেষ হয়নি।
![]()
পরদিন ছিল শুক্রবার—সরকারি ছুটির দিন। সাধারণ মানুষের কাছে ছুটির দিন মানে বিশ্রাম। কিন্তু শ্রমিকের পাওনা যখন অনিশ্চিত, তখন ছুটিও যেন ছুটি নয়।
শুক্রবারও যেতে হলো শিল্প পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে।
আগের দিন করা অভিযোগের তদারকির দায়িত্ব পেয়েছিলেন ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন। তাঁর পক্ষে একজন এসআই বকুল ও মোমেনার কাছ থেকে বিস্তারিত ঘটনা শুনে নোট করে নেন। অভিযোগের প্রতিটি বিষয় জানতে চান। শ্রমিকদের প্রত্যাশা তখন একটাই—এবার যেন তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অভিযোগ করার প্রায় তিন মাস পরও যেখানে তারা কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাননি, সেখানে শিল্প পুলিশের এই উদ্যোগ তাদের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দেয়।
সময় গড়াল।
অবশেষে সেই অপেক্ষারও শেষ হলো।
শিল্প পুলিশের মধ্যস্থতায় বকুল ও মোমেনা তাদের বকেয়া মজুরি আদায় করতে সক্ষম হলেন। দীর্ঘদিনের পাওনা হাতে ফিরে পেলেন দুই শ্রমিক। তাদের কাছে সেই টাকা শুধু বকেয়া মজুরি ছিল না—ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, ন্যায্য অধিকারের স্বীকৃতি এবং লড়াই করে দাবি আদায়ের এক বাস্তব উদাহরণ।
বকুল ও মোমেনার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তার শ্রমের বিনিময়ে প্রাপ্য অধিকার।
আর সেই অধিকার আদায়ে দরজায় দরজায় ঘুরতে হলেও লড়াই থামানো যাবে না।
কারণ শ্রমিকের কণ্ঠ যতক্ষণ জাগ্রত থাকে, ন্যায্য পাওনা আদায়ের পথ ততক্ষণ বন্ধ থাকে না।
শ্রমজীবী মানুষের জয় হোক।
দুনিয়ার মজদুর এক হও।