বিজন ভাবনা (৬৩) রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচন ২০২৬ -বিজন সাহা
![]()
রাশিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার কামচাতকা সময় সকাল ০৮.০০ টায় শুরু হয়ে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার কালিনিনগ্রাদ সময় সন্ধ্যা ২০.০০ টায় শেষ নির্বাচন কেন্দ্র বন্ধের মধ্য দিয়ে এবারের মত পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষ হল। রাশিয়ায় বছরে দুইবার নির্বাচন হয় – মার্চের তৃতীয় শুক্রবার থেকে রবিবার আর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় শুক্রবার থেকে রবিবার। দেশের সমস্ত নির্বাচন এই সময়েই হয়। এবার পার্লামেন্টের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় নির্বাচন হয়েছে। আগে অবশ্য মাত্র একদিন নির্বাচন হত, যদি ভুল না করি সেটা ছিল রবিবার। যেহেতু নির্বাচন এমন এক সময়ে হয় যখন বেশির ভাগ লোক খামার বাড়িতে থাকে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে, তাই ভোটারদের উপস্থিতি কম হত। করোনার সময়ে যাতে লোকজন ভিড় না করে, তাই ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিন দিন ব্যাপী ভোটের আয়োজন করা হয়। সেটা মানুষের মধ্যে এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে পরে নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে তিন দিন ব্যাপী নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সোভিয়েত আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এদেশের নির্বাচন বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। আমার দেখা ও বোঝা মতে সেসবের মূলে ছিল মানুষ যাতে যতদূর সম্ভব সহজ ভাবে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে আবার সেটা করতে গিয়ে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত না হয় সেটা নিশ্চিত করা।
সোভিয়েত আমলে, বিশেষ করে পেরেস্ত্রইকার সময়ে ভোট মানে ছিল উৎসব। তবে সেটা বাহ্যিক। ভোট কেন্দ্রে বিভিন্ন জিনিষপত্র বিক্রি করা হত, আর যেহেতু দেশের পণ্যের স্বল্পতা ছিল, তাই মানুষ এজন্য হলেও ভোট কেন্দ্রে যেত। কিন্তু তখন কোন বিকল্প ছিল না। এটা ছিল অনেকটা রেফারেন্ডাম মত। পরে পার্টি একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে দাড় করায়। তাতে গণতন্ত্রের কিছুটা ছোঁয়া থাকলেও তা ছিল গণতন্ত্র থেকে বহু দূরে। এরপর আসে নব্বইয়ের দশক। একাধিক রাজনৈতিক দল তাতে অংশগ্রহণ করে। এরকম প্রথম নির্বাচন হয় সোভিয়েত আমলেই। আর তার উল্লেখযোগ্য বিষয় হল সেই নির্বাচনে পার্টির প্রার্থীকে পরাজিত করে বরিস ইয়েলৎসিন রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সেটা ছিল সত্যিকার অর্থেই গণতন্ত্রের জয়জয়কার। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি বিলোপ পেলেও ইয়েলৎসিন নিজের পার্টি গড়ে তুলতে অক্ষম হন। ফলে সেই সময় পার্লামেন্ট আর প্রেসিডেন্ট মূলত দুই শত্রু শিবিরে অবস্থান গ্রহণ করে। যার ফলশ্রুতি ১৯৯৩ সালে ইয়েলৎসিনের পার্লামেন্ট ভবন আক্রমণ, সেই ভবন যেখানে মাত্র দুই বছর আগে ১৯৯১ সালের আগস্টে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন আর আমাদের মত হাজার হাজার মানুষ (আমি নিজেও ছিলাম সেই জনস্রোতে) তাঁকে রক্ষা করেছিল সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে। এরপর ১৯৯৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। রাশিয়ার নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনা। আক্ষরিক অর্থেই জোর করে কমিউনিস্ট পার্টির গেন্নাদি জুগানভের বিজয় চুরি করে নেয়া হয় আর সেটা করা হয় আমেরিকা তথা পশ্চিমা বিশ্বের সরাসরি হস্তক্ষেপে। দেশে সম্পূর্ণ ভাবে জিম্মি হয় অলিগারখদের কাছে। মানুষ ধীরে ধীরে মুখ ফেরাতে শুরু করে তথাকথিত লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের দিক থেকে। রাশিয়ার পশ্চিমা গণতন্ত্রীদের শেষের শুরু মনে হয় এখানেই। তবে এরপর নির্বাচন যতই প্রতিনিধিত্বমুলক হয়েছে, নির্বাচন যতই এদেশের মানুষের সমর্থন পেয়েছে, পশ্চিমা বিশ্ব তত বেশি চেষ্টা করেছে সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে। কারণ তাদের দরকার গণতন্ত্র নয়, তাদের দরকার নিজেদের অনুগত সরকার।
বর্তমানে রাশিয়ায় ভোট দেয়া যায় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে অথবা অনলাইনে। তবে অনলাইনের ব্যবস্থা এখনও সব অঞ্চলে প্রয়োগ করা হয়নি মূলত প্রযুক্তিগত কারণে। ৮৯ টি অঞ্চলের মধ্যে ৩৩ টি অঞ্চল বর্তমানে এর আওতায়। কেউ যদি নিজের কেন্দ্রে ভোট দিতে অপারগ হয়, তবে সে আগে থেকে অন্য কেন্দ্রে ভোট দেবার অনুমতি নিতে পারে অনলাইনে। পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রত্যেকের দুটো ভোট – একটি দলকে, আরেকটি প্রার্থীকে। প্রার্থীদের আগে বিজয়ের জন্য কম পক্ষে ৫০%+১ ভোট লাগত, এখন যে বেশি ভোট পায় তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। আসলে ৫০%+১ ভোট অনেক প্রতিনিধিত্ব মূলক। তবে এক্ষেত্রে প্রায়ই দ্বিতীয় ট্যুরের আয়োজন করতে হয়। সেটা ব্যয়বহুল। তারচেয়েও বড় কথা দ্বিতীয় ট্যুরে ভোটারদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক ভাবে কম। রাশিয়ার নির্বাচন প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। এক সময় কোন প্রার্থীই পছন্দের না হলে সবার বিরুদ্ধে ভোট দেবার উপায় ছিল। এতে করে অনেক কেন্দ্রে ভোট বাতিল হত। কেন না সবার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়লে তাদের বাদ দিয়ে নতুন প্রার্থী নিয়ে ভোট গ্রহণ করা হত। পরিবর্তনের উদ্দেশ্য একটাই – নির্বাচন ব্যবস্থাকে কার্যকরী করে তোলা। উল্লেখ্য যে এদেশে বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই ভোট গ্রহণ শুরু করা হয়। সেটা মূলত দুর্গম এলাকায়, এই সময় যেসব জাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকে তাদের। তুন্দ্রা এলাকায় যেসব হরিণ পালক জনপদ থেকে দূরে থাকে তাদের জন্য স্পেশাল প্লেনে বা হেলিকপ্টারে করে ব্যালট পেপার পাঠানো হয়। একই ভাবে হাসপাতালে বা বিছানায় পড়া রুগীদের ভোট বাড়ি গিয়ে আনা হয়। অবশ্য সেটা যদি এরকম লোক নির্বাচন কমিশনে আবেদন জানায়। এসব ভোট বাক্স খোলা হয় অন্য সব বাক্সের সাথেই। সেদিক থেকে বলা যায় – ম্যাক্সিমাম চেষ্টা করা হয় যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে ভোট দেবার সুযোগ পৌঁছে দেবার। ভোট কেন্দ্রে প্রতিটি দল ও প্রার্থীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি থাকে। থাকে প্রতিটি দলের পর্যবেক্ষক। ভোটের এক দিন আগে থেকেই সমস্ত প্রচার নিষিদ্ধ। তাই নির্বাচন কেন্দ্রে কেউ ক্যানভাস করলে সেই দলের ভোট বাতিল হবার সম্ভাবনা থাকে ঐ কেন্দ্রে। অনলাইনে ভোট দেয়া যায় গসউস্লুগি নামে স্পেশাল প্ল্যাটফর্ম থেকে। এদেশের প্রতিটি নাগরিকের এটা আছে, যার মাধ্যমে সে প্রায় সব অফিসিয়াল কাজ করতে পারে। ওখানে ভোটের যে উইন্ডো আছে সেখানে চাপলে একটা কোড আসে সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত টেলিফোন নম্বরে। তাই অন্য কেউ সেখানে ঢুকে ভোট দিতে পারে না। ওই কোড দিয়ে অনলাইন নির্বাচন কেন্দ্রে ঢুকতে হয়। চাইলে শুধু পরিচিত হওয়া যায় অথবা ভোট দেয়া যায়। ভোট দেবার অপশন বেছে নিলে এক ঘন্টা সময় থাকে ভোট দেবার জন্য। প্রথমে আসে পার্টি লিস্ট, নাম ও যারা পার্টি লিস্টের মুখ। যেমন উইনাইটেড রাশিয়ার মুখ লাভরভ, সাবিয়ানিন, পদ্দুবনি, কমিউনিস্ট পার্টির জুগানভ, কানাভালভ, আফনিন ইত্যাদি। এবারে দশটি দল নির্বাচনে অংশ নেয়। এখান থেকে কাউকে ভোট দিলে বা এড়িয়ে গেলে এরপর আসে একক প্রার্থীদের লিস্ট। সেটা হতে পারে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী। সেখানে প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাওয়া যায়।
কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে জানতে চেয়েছে যে এই নির্বাচনের ফলাফল মোটামুটি আগে থেকেই ঠিক করা থাকে কিনা। প্রশ্ন হলো ভোটারদের ভোট দেয়া বা না দেয়ার গুরুত্ব কতটা সেটা বোঝা। হতে পারে কিছু ভোটারের ভোট দেয়া মানেই পূর্ব নির্ধারিত ফলাফলকে বিশ্বাসযোগ্য বা প্রশ্নবিদ্ধ হতে না দেয়া। অথবা না দেয়া মানে ভোট প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা বা প্রশ্নবিদ্ধ করা। নাকি ব্যাপারটা মোটেও ফেব্রিকেটেড নয়! সব প্রার্থীদের বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক বা ভোট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সবকিছু আছে। যেমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধী মত প্রকাশের অধিকার ইত্যাদি।
এর উত্তরে উল্টো প্রশ্ন করা যায় এখানে গণমাধ্যম কি স্বাধীন নয়? পশ্চিমা বিশ্বের গণমাধ্যমেও দনবাস থেকে পশ্চিমা ব্লগার, যারা তাদের দেশের অফিসিয়াল ভার্সন প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাদের খবরাখবর প্রকাশ করা হয় না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই বলার অধিকার নয়। পশ্চিমা বিশ্বে বিবিসি, সিএনএন বা এ ধরণের গণমাধ্যমে আল কায়েদা বা আইএসএস-এর প্রোপাগান্ডা করতে দেবে? আমেরিকায় তো এক সময়ে কমিউনিস্ট প্রোপাগান্ডা নিষিদ্ধ ছিল। বাংলাদেশে যদি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অপপ্রচার আইন করে বন্ধ করা হত সেটাকে কি আমরা বাকস্বাধীনতা খর্ব করা হচ্ছে বলে মনে করতাম? আসলে প্রতিটি দেশেই কিছু না কিছু বিষয় থাকে যা নিয়ে প্রোপাগান্ডা আইনত দণ্ডনীয়। আইন ভাল বা মন্দ হতে পারে, কিন্তু মূল কথা সেটা সবার জন্য সমান ভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কিনা। এই মুহূর্তে রাশিয়ার যুদ্ধের ব্যাপারে অপপ্রচার, সেনাদের ক্ষতি করতে পারে এমন খবর প্রকাশ বা তাদের সম্পর্কে মিথ্যা অপপ্রচার আইনত দণ্ডনীয়। তাই বিরোধী মতামত প্রকাশের অধিকার থাকলেও কিছু কিছু বিষয়ে রেস্ট্রিকশন সবার জন্যই আছে। যেমন সমকামিতা এ দেশে অপরাধ নয়, কিন্তু সমকামিতার প্রোপাগান্ডা বিশেষ করে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে সমকামিতার প্রোপাগান্ডা দণ্ডনীয়। আমরা ইউরোপের কথা বলি। কিন্তু সেখানে কি ঘটছে? গত বছর রোমানিয়ার নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থীকে আদালতের মাধ্যমে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন করতে দেয়া হয়নি। মালদাভিয়ায় ইউরোপের অভিবাসীদের ভোটে সান্দো জিতেছে অথচ সবচেয়ে বেশি ভোটার যেখানে সেই রাশিয়া ৮০ ভাগ মালদাভিয়ান নাগরিক ভোট দেবার সুযোগ পায়নি। এমনকি যারা ইউরোপ হয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করেছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন তাতে বাধা দিয়েছে। তাই গণতন্ত্রের কথা বলে লাভ নেই। গণতন্ত্র আর পুঁজিবাদ এক নয়। এমনকি জার্মানি চেষ্টা করছে অল্টারনেটিভ ফর জার্মানিকে নিষিদ্ধ করতে বা তাকে জিততে না দিতে। পারেনি তাদের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে। ফ্রান্সে লিপেনকে তো প্রায় গায়ের জোরে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা হয়। এখানে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী যারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে তারা সরকার থেকে সমান আর্থিক ও প্রচারের সুযোগ পায়। তবে ভোটে দাঁড়ানোর জন্য আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ জনসমর্থন প্রমাণ করতে হয় স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। যে সমস্ত দল পূর্ববর্তী পার্লামেন্টে ছিল না তাদের নির্বাচনে অংশ নেবার জন্য সারা দেশ থেকে দুই লাখ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হবে, তবে কোন অঞ্চলে ৭৫০০ হাজারের বেশি হতে পারবে না। অর্থাৎ সারা দেশেই তাদের কমবেশি সমর্থন আছে সেটা দেখাতে হবে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য তার নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের ০.৫% স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়। সেই অর্থে নির্বাচনে অংশ নেবার অনেক আগে থেকেই কাজ শুরু করতে হয়। তবে স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করা যায় শুধু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করার পরে। যে সমস্ত দল ও প্রার্থী এভাবে নির্বাচনে অংশ নেবার সুযোগ পায় তারা নির্বাচন কমিশনের খরচে প্রচার করতে পারে। তবে কেউ যদি এর বাইরেও নিজদের খরচে প্রচার কাজ চালাতে চায় সেটাও একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি হতে পারে না। এটা অনেকটা আইপিএল-এর প্লেয়ার কেনার মত। এর আগে একাধিক বার নাভালনি ও অন্য লিবারেল দল সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে, ধারণা করা যায় ইচ্ছে করেই করেছে যাতে নির্বাচনের আগেই এ নিয়ে শোরগোল তোলা যায়। যদি রাশিয়ার কথা বলি তবে ১৯৯৬ সালে ইয়েলৎসিনকে জেতানোর জন্য ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল আমেরিকার তত্ত্বাবধানে। এখন সেটা হয় না। কারণ পুতিনের জনপ্রিয়তা। অন্যরা মূলত তাদের ভোটব্যাঙ্কের ভোট পায়। এখানে শতাধিক দেশের পর্যবেক্ষক মনিটরিং করে। কোন রিপোর্ট পেলে তারা বা দলের প্রতিনিধি নির্বাচন ক্মিশঙ্কে জানায়, কমিশন সাথে সাথে ব্যবস্থা নেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পর, বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের ভোট কারচুপির পর রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেললে বিগত সময়ে এরা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দল ও ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। তাই সেটা হারানোর কোন কারণ দেখি না। ফলাফল ফেব্রিকেটেড নয়। বর্তমান ফলাফল দেশের সার্বিক পরিস্থিতির বহিঃপ্রকাশ। এখন এখানে পশ্চিম পন্থী রাজনৈতিক দল নেই। এজন্য দায়ী নব্বইয়ের দশকে তাদের অযোগ্যতা আর পশ্চিমা বিশ্বের রুশ বিরোধী রাজনীতি। তাছাড়া বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বকে গণতন্ত্রের এটালন হিসেবে ভাবার কোন কারণ নেই। আর প্রতিটি দেশের আছে নিজস্ব ইতিহাস, নিজস্ব আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক, নিজস্ব ঐতিহ্য। একই অসুখে বিভিন্ন র্গিকে বিভিন্ন ওষুধ দেয়া হয় রুগির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। তাই সব দেশের গণতন্ত্রের মাথায় একই বাটি বসিয়ে চুল কাটলে নেকের চেহারা কদর্য রূপ ধারণ করতে পারে।
আমাদের দেশে রাশিয়া সম্পর্কে মতামত গড়ে উঠে মূলত পশ্চিমা বিশ্বের খবরাখবর পড়ে। শুধু তাই বা বলি কেন? চব্বিশের অনেক কুশীলবদের সার্টিফিকেট কি পশ্চিমারাই দেয় নাই? পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা রাশিয়ার ব্যাপারে বায়াস। পশ্চিমা বিশ্ব বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেছে নির্বাচন বানচাল করতে। মানুষ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে বা অনলাইনে ভোট দিয়ে এর উত্তর দিয়েছে। অর্ধশতাধিক দেশের সাথে যুদ্ধ করে রাশিয়া যে শুধু অর্থনৈতিক ভাবে ভেঙে পড়েনি বরং আগের চেয়ে বেশি স্বাবলম্বী হয়েছে তার মূল কারণ এদেশের মানুষের ঐক্য। ওরা নিজেদের মানসিকতা দিয়ে রুশদের বিচার করে, আর রুশরা একেবারেই ভিন্ন মানসিকতার মানুষ। তাই ওরা বারবার ভুল করে। সেটা নেপোলিয়ন হোক, হিটলার হোক আর কালেক্টিভ পশ্চিমা বিশ্ব হোক।
রাশিয়ায় নব্বইয়ের দশকে যখন একের পর এক রাজনৈতিক দল গঠিত হতে থাকে তখন তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল আমাদের দেশের দলগুলোর মতই। প্রতিটি দল চেষ্টা করত অন্য দলের চলার পথে কাঁটা ছড়াতে। বেশ কয়েক বছর আগে, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব যখন একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে থাকে রাশিয়ার উপর তখন তারা একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান নিজেদের জন্য আবিষ্কার করে – “দল আমাদের ভিন্ন কিন্তু দেশ আমাদের একটাই।” এর ফলে পার্লামেন্টে বিভিন্ন দলের মধ্যে সম্পর্কের গুণগত পরিবর্তন ঘটে। যেকোনো যৌক্তিক প্রস্তাব, তা সে যে দলই উত্থাপন করুক না কেন, গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়, এমনকি গ্রহণ করা হয়। এখানে যে বিভিন্ন পার্লামেন্ট কমিটি গঠিত হয় তার অনেকগুলোর প্রধান নির্বাচিত হয় বিরোধী দল থেকে। ফলে প্রতিটি দল দেশ গঠনে নিজেদের অংশীদার মনে করে। এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে। যদিও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যুদ্ধের মধ্যেই হয়েছে, তবে এবার আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধ রাশিয়ার ভেতরে প্রবেশ করেছে। এমনকি নির্বাচনের সময়ে ইউক্রেনের ড্রোনের আঘাতে লোকজন মারাও গেছে, খোদ মস্কোয় আবাস বাড়িতে আক্রমণ হয়েছে। দনবাসে ড্রোন হামলায় স্থানীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান নিহত হন। শুধু ইউক্রেন নয়, পশ্চিমা বিশ্ব বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেছে নির্বাচন ভন্ডুল করতে। সাইবার আক্রমণ হয়েছে বার বার। মানুষ তাদের উপস্থিতি দিয়ে সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। প্রতিটি দল শুধু নিজের হয়ে নয় দেশের হয়ে প্রচার করেছে, বলেছে যাকে খুশি ভোট দাও কিন্তু ভোট দাও। এই জয় আমাদের দলের নয়, এই জয় রাশিয়ার জয়। আবারও দলের উপরে দেশকে স্থান দেয়া হয়েছে। আসলে বিজয় মানেই জিতে যাওয়া নয়। বাংলাদেশের বিগত নির্বাচনে আমরাও বিএনপির পক্ষে ভোট চেয়েছিলাম জামায়াত ঠেকাতে। নির্বাচনে জিতেছে বিএনপি কিন্তু বাংলাদেশ জিতেছে কি? বিজয়ের কারণ ও গুরুত্ব না বুঝলে সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে বিজয়ে তরুণ সমাজের অবদানের কথা বুঝতে পারেনি, যেমন বুঝতে পারেনি শাহবাগ আন্দোলনে মুক্তমনাদের অবদান। স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে আঁতাত করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতাই হারিয়ে ফেলতে বসেছে। দেশে অনেকেই বলতে চায় রাশিয়ায় তো সব দল পুতিনের নির্দেশে চলে। কথাটি ঠিক নয়। এখানে সব রাজনৈতিক দলকে তাদের আয়ের উৎস দেখাতে হয়। যদি কোন দল বিদেশ থেকে সাহায্য পায় বা নেয় তাদের সরকারি কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেয়া হয় না। এটা আমেরিকায় আছে অনেক আগে থেকেই। এক সময় পশ্চিমা বিশ্ব অর্থ দিয়ে এদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে এরা এই আইন প্রণয়ন করে। আমাদের দেশেও এসব ভেবে দেখা দরকার। ইউক্রেনের রুশ ভাষাভাষীদের সমর্থন করলে, তাদের মুক্তির সংগ্রামে সমর্থন দিলেই পুতিনকে সমর্থন করা হয় না। ঠিক যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বললেই আওয়ামী লীগের দালাল হয় না। সমস্যা হল, মানুষ একই জিনিষ দুই ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভাবে নেয়। যারা বাহান্নর ভাষা আন্দোলন সমর্থন করে তাদের অনেকেই দনবাসের রুশ ভাষাভাষীদের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার সমর্থন করে না। রুশ ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষার দাবি থেকেই কিন্তু দনবাসের আন্দোলন শুরু হয় ২০১৪ সালে।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে এদেশে নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশের মত এত মিটিং মিছিল নেই। নির্বাচন কমিশন সব দলকে সমান পরিমাণ অর্থ ও টিভি টাইম দেয়। এছাড়া সরকারি খরচে ডিবেট হয় বিভিন্ন দলের মধ্যে। নির্বাচন হয় তিন দিন ব্যাপী। অফ লাইন, অন লাইন সব ভাবে। অনলাইনের ভোট নিয়ে যাতে প্রশ্ন না থাকে নির্বাচনের শুরুতে গোপন কোড ভেঙে সব দলকে দেয়া হয়। নির্বাচন শেষে সবাই নিজ নিজ অংশ ফেরৎ দিলে অনলাইন ভোটের বাক্স খোলা যাবে। রাশিয়ার পার্লামেন্টে মোট ৪৫০ টি আসন। ২২৫ টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়, বাকি ২২৫ টি আসন পায় বিভিন্ন দল প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে। তবে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মিনিমাম ৩% ভোট পেতে হয়। এবার মোট ১০ টি দল বা জোট নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। এবার রেজিস্টার্ড ভোটারের সংখ্যা ছিল ১১১ মিলিয়নের একটু বেশি আর ভোট দিয়েছে ৫৯% এর বেশি যা রেকর্ড। প্রায় ৯৮% ভোট গণনার পরে ফলাফল নিম্নরুপঃ
ইউনাইটেড রাশিয়া (পুতিনের দল) ৫৭.৮২%, সরাসরি নির্বাচিত প্রার্থী সহ তারা পেয়েছে মোট ৩৪৭ আসন (গত নির্বাচনের তুলনায় + ২৪), কমিউনিস্ট পার্টি – ১৩.৮%, মোট আসন ৩৮ (-১৯), এলডিপিআর (ঝিরিনভস্কি) ৮.৯৯%, মোট আসন ২৪ (+৩), নিউ পিপল – ৭.৯৭%, মোট আসন ১৯ (+৬), জাস্ট রাশিয়া (মিরোনভ), ৪.৯৬%, মোট আসন ১৬ (-১১), পেনশিওনার পার্টি ১.৯৯%, গ্রীন পার্টি – ১.১৬%, রাশিয়ার কমিউনিস্ট – ০.৮৫%, মাতৃভূমি – ০.৭২% ও ডাইরেক্ট ডেমোক্র্যাসি – ০.৩৫%, মানে শেষের পাঁচ দল পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করছে না। ১৩৩ দেশের ১১২৬ জন প্রতিনিধি এবার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। রাশিয়ার বাইরে ১৫২ টি দেশে ৩৩৩ টি নির্বাচনী কেন্দ্র কাজ করেছে। এবার নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হয়েছে তাদের একটি বড় অংশ যুদ্ধ ফেরত সেনারা। ১৯৭১ এ বিজয়ের পরে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্য রকম সম্মান ছিল। এখানেও ব্যতিক্রম নয়। যারা জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করেছে মানুষ তাদের বিশ্বাস করে। এই ভোট তার প্রমাণ। এই ভোট আবার প্রমাণ করল মানুষ বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল ও তাদের রাজনীতি সমর্থন করে। এই পুঁজি তারা কীভবে ব্যবহার করবে – সেটা ভবিষ্যতই বলবে।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো