যে গল্পগুলো লেখা হয়নি-৩ -ফজলুল কবির মিন্টু

একজন মা শ্রমিকের গল্প: নাজমা বেগমের সংগ্রাম

শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক মানুষের গল্পের সাক্ষী হয়েছি। কিছু গল্প কাগজে লেখা হয়নি, কিছু গল্প শুধু স্মৃতিতে রয়ে গেছে। নাজমা বেগমের গল্প তেমনই একটি গল্প—একজন মা শ্রমিকের হয়রানি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের গল্প।

নাজমা বেগম রিজী এপারেলস নামের একটি পোশাক কারখানায় সহকারী অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল তিনি সেখানে যোগ দেন। নিয়মিত কাজ করছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই তার কর্মজীবনে নেমে আসে নতুন এক সংকট।

সন্তান জন্মদানের সম্ভাব্য তারিখ ছিল ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি। মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নাজমা। একজন শ্রমিকের কাছে এটি স্বাভাবিক একটি অধিকার। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে যেন সেটিই হয়ে উঠল সমস্যা।

একদিন কারখানার পার্সোনাল অফিসার সরোয়ার তাকে ডেকে বললেন, এই কারখানায় মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার কোনো রেওয়াজ নেই। শুধু তাই নয়, তাকে চাকরি থেকে রিজাইন দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হলো।

নাজমা রিজাইন দিতে অস্বীকৃতি জানালেন।

এরপর তার ওপর চাপ আরও বাড়ল। তার আইডি কার্ড কেড়ে নেওয়া হলো। সাদা কাগজ ও দুটি ফরমে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হলো। এরপর তাকে বলা হলো—

“তোমার রিজাইন হয়ে গেছে। ৭ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে এসে বেতন নিয়ে যেও।”

একজন সন্তানসম্ভবা নারী শ্রমিকের কাছে কথাগুলো কতটা ভয়ংকর ছিল, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। সামনে সন্তান জন্মদানের সময়। অথচ সেই মুহূর্তে তার চাকরি, আয় এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছু অনিশ্চিত করে দেওয়া হলো।

কিন্তু নাজমা একা ছিলেন না।

তার এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন শ্রমিকনেতা আব্দুল ওয়াদুদ জীবন। নাজমাকে তিনি শুধু পরামর্শ দেননি; কীভাবে এগোতে হবে, কার কাছে যেতে হবে, কীভাবে নিজের অধিকার দাবি করতে হবে—এসব বিষয়ে বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে তাকে সাহস জুগিয়েছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নাজমা যাতে ভেঙে না পড়েন, সেদিকেও তিনি পাশে থেকেছেন।

আব্দুল ওয়াদুদ জীবনের মাধ্যমেই নাজমা আমার কাছে আসেন। বিষয়টি শুনে আমি রিজী এপারেলস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি বাতিলের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানাই।

আমাদের প্রতিবাদের ফলে শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। নাজমা শ্রম আইন অনুযায়ী প্রথম ৫৬ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও মজুরি পান।

কিন্তু তার লড়াই তখনও শেষ হয়নি।

সন্তান জন্মের পর মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে যখন কাজে ফেরার সময় হলো, তখন নাজমা নতুন একটি সমস্যার মুখোমুখি হলেন। কারখানায় কোনো ডে-কেয়ার সেন্টার নেই। শিশুকে কোথায় রাখবেন—এই প্রশ্নেরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।

কর্তৃপক্ষ তাকে বাচ্চার কাঁথা-বালিশ নিয়ে আসতে বলল।

নাজমা তাই করলেন। একজন মা শ্রমিকের কাছে কর্মস্থল আর মাতৃত্ব যেন আলাদা দুটি জগৎ নয়—তার শিশুও তার জীবনের অংশ। কাঁথা-বালিশ নিয়ে শিশুকে সঙ্গে করে কয়েকদিন তিনি কাজ করলেন।

এরপর করোনা মহামারি এলো। শিশুর দেখাশোনার জন্য যে শ্রমিককে রাখা হয়েছিল, তার চাকরি চলে গেল। তখন কর্তৃপক্ষ নাজমাকে মজুরিসহ ছুটি দিল।

কিছুদিন পর আবারও কাজে না ফেরার পরিস্থিতি তৈরি হলো।

কিন্তু ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর নাজমার আইডি কার্ড আবার কেড়ে নেওয়া হলো। এবার তাকে চাকরি থেকেই বিতাড়িত করা হলো।

একজন মা শ্রমিকের বিরুদ্ধে হয়রানির যেন শেষই ছিল না।

নাজমা আবারও আব্দুল ওয়াদুদ জীবনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তিনি সাহস দিলেন—পিছু হটলে হবে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। তার পরামর্শেই আমরা বিষয়টি আইনি পথে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ—বিলসের সহযোগিতায় এবং আব্দুল ওয়াদুদ জীবন ও আমার পরামর্শে নাজমা চট্টগ্রাম শ্রম আদালত-২-এর দ্বারস্থ হলেন।

তার পক্ষে প্রথমে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট জানে আলম। কিন্তু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি অকালে মারা যান। এরপর তারই সুযোগ্য কন্যা অ্যাডভোকেট ফারাহানা আলম এনি বাবার অসমাপ্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।

শুরু হলো দীর্ঘ অপেক্ষা।

একজন শ্রমিকের কাছে আদালতের প্রতিটি তারিখ মানে শুধু একটি তারিখ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংসারের খরচ, সন্তানের প্রয়োজন, নিজের ভবিষ্যৎ এবং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

নাজমাকেও সেই অপেক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

অবশেষে ২১ মার্চ ২০২৪ তারিখে রায় হলো। দীর্ঘ ,২২৭ দিনের আইনি লড়াইয়ের পর আদালত নাজমার অভিযোগ সত্য বলে স্বীকার করলেন। চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তাকে স্বপদে ও সবেতনে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হলো।

নাজমা জয়ী হলেন।

কিন্তু এই জয়েও কিছু প্রশ্ন থেকে গেল।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২১৬ অনুযায়ী শ্রম আদালতে মামলা দায়েরের পর ৬০ দিনের মধ্যে রায় দেওয়ার কথা। বিশেষ কারণে তা সম্ভব না হলে কারণ উল্লেখ করে আরও ৯০ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি হওয়ার কথা।

কিন্তু নাজমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১,২২৭ দিন।

আর এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কর্মহীন ছিলেন, আয়হীন ছিলেন। অথচ রায়ে মামলাকালীন ১,২২৭ দিনকে বিনা বেতনের ছুটি হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

এখানেই আমার মনে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—

অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচার চাইতে গিয়ে একজন শ্রমিক যদি বছরের পর বছর কর্মহীন থাকেন, তাহলে সেই অপেক্ষার দায় কে নেবে?

নাজমার গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একজন শ্রমিকের লড়াইয়ে সহযোদ্ধার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

নাজমা হয়তো অন্যায়ের শিকার হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি একা লড়েননি। আব্দুল ওয়াদুদ জীবন তার সাহসের অন্যতম প্রধান উৎস ছিলেন। তার বুদ্ধি, পরামর্শ, সাহস জোগানো এবং পাশে থাকার কারণে নাজমা বারবার ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছেন। আর প্রয়োজনের সময়ে আমিও তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।

আজ নাজমার গল্প মনে করলে মনে হয়, শ্রমিকের অধিকার শুধু আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রয়োজন সাহস, প্রয়োজন সংগঠন, প্রয়োজন পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ এবং প্রয়োজন দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিক শক্তি।

নাজমা একজন মা। তিনি একজন শ্রমিক। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।

তার গল্প তাই শুধু একটি মামলা জয়ের গল্প নয়।

এটি একজন মা শ্রমিকের ওপর হয়রানির গল্প।
এটি অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প।
এটি একজন শ্রমিকনেতার সাহস জোগানোর গল্প।
এটি দীর্ঘ অপেক্ষার পর খন্ডিত ন্যায়বিচার পাওয়ার গল্প।

আর নাজমার গল্প আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়—

শ্রমিকের অধিকার রক্ষার জন্য আইন যদি থাকে, তাহলে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এত দীর্ঘ অপেক্ষা কেন?

নাজমাদের জন্য আমাদের লড়াই তাই শুধু আদালতে নয়—কর্মক্ষেত্রেও, সমাজেও এবং রাষ্ট্রের কাছেও