জাহাজভাঙা শিল্পে মৃত্যুর মিছিল: ফেরদৌস স্টিলে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু কি আরেকটি সতর্কবার্তা? -ফজলুল কবির মিন্টু

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ১৪ আগস্ট ২০২৬ ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করল—বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের জীবন এখনো কতটা অনিরাপদ। জাহাজের অভ্যন্তরে গ্যাস ট্যাংক কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে একে একে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনার ঘটনা নয়; এটি কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, জরুরি উদ্ধার, সরকারি তদারকি এবং মালিকপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন সামনে এনেছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে নোঙর করা একটি জাহাজের অভ্যন্তরে গ্যাস ট্যাংক কাটার কাজ চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে দুই শ্রমিক বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে আরও শ্রমিক আক্রান্ত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক শ্রমিক মারা যান। প্রাথমিকভাবে হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়াকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে কাটার ফোরম্যান, কাটারম্যান, সেফটি অফিসার, সাব-কন্ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী ছিলেন। ফলে এটি শুধু শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; বরং পুরো কাজের পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
মৃত্যুর এই সংখ্যা কি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা?
ফেরদৌস স্টিলের ৯ শ্রমিকের মৃত্যু বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে দীর্ঘদিনের প্রাণহানির ধারাবাহিকতারই অংশ। ২০১৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে দুর্ঘটনায় মোট ১৪৯ জন শ্রমিক নিহত এবং ৩১২ জন আহত হয়েছেন। ২০১৫ ও ২০২২ সালের আহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বছরভিত্তিক তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮ জন, ২০১৭ সালে ১৯ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৯ সালে ২৩ জন, ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ১৩ জন, ২০২২ সালে ৭ জন, ২০২৩ সালে ৭ জন, ২০২৪ সালে ৭ জন, ২০২৫ সালে ৪ জন এবং ২০২৬ সালে ১২ জন শ্রমিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন শত শত শ্রমিক।
অর্থাৎ বছরের পর বছর দুর্ঘটনা ঘটছে, শ্রমিক মারা যাচ্ছেন, অনেকে আহত ও পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছেন; কিন্তু তারপরও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্নটি স্থায়ীভাবে সমাধান হয়নি।
ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় যে প্রশ্নগুলো এড়ানো যাবে না
এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—জাহাজের অভ্যন্তরে কাজ শুরুর আগে গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না?
বদ্ধ ট্যাংক বা জাহাজের অভ্যন্তরে কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতি আছে কি না, গ্যাসের মাত্রা কত, অক্সিজেনের পরিমাণ নিরাপদ কি না—এসব পরীক্ষা ছাড়া শ্রমিককে প্রবেশ করানো হলে তা জীবনঘাতী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পোশাক, মাস্ক, অক্সিজেন ও অন্যান্য সেফটি সরঞ্জাম না থাকার অভিযোগ এসেছে। একই সঙ্গে আহত শ্রমিকদের হাসপাতালে নিতে বিলম্বের অভিযোগও রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—ইয়ার্ডে কোনো অ্যাম্বুলেন্স ছিল না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একজন স্থানীয় ব্যক্তি নিজের পকেটের টাকা খরচ করে কয়েকজন আক্রান্ত শ্রমিককে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
একটি উচ্চঝুঁকির শিল্পে যেখানে বিষাক্ত গ্যাস, বদ্ধ স্থান এবং ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার প্রতিদিনের বাস্তবতা, সেখানে জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থার এমন দুর্বলতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
একজনকে উদ্ধার করতে গিয়ে আরও শ্রমিকের মৃত্যু
দুর্ঘটনার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—প্রথম আক্রান্ত শ্রমিকদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে আরও শ্রমিক আক্রান্ত হন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা শিক্ষা সামনে আনে।
বিষাক্ত গ্যাসপূর্ণ বদ্ধ স্থানে প্রশিক্ষিত রেসকিউ টিম, উপযুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের সুরক্ষা সরঞ্জাম, অক্সিজেন এবং রেসকিউ হার্নেস ছাড়া প্রবেশ করা হলে উদ্ধারকারী নিজেই দ্বিতীয় দফা দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। ফেরদৌস স্টিলের ঘটনায় এমন পরিস্থিতির অভিযোগই সামনে এসেছে।
অর্থাৎ দুর্ঘটনা ঘটার আগেই যেমন প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল বলে অভিযোগ, দুর্ঘটনার পরও তেমনি একটি কার্যকর জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
‘গ্যাস ফ্রি’ সনদ নিয়েও প্রশ্ন
ফেরদৌস স্টিলে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—জাহাজটি কাটার আগে নিয়ম অনুযায়ী ‘গ্যাস ফ্রি’ সনদ নেওয়া হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে সেই সনদ কতটা কার্যকরভাবে যাচাইয়ের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল?
যদি জাহাজটি সত্যিই যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত হিসেবে প্রত্যয়ন করা হয়ে থাকে, তাহলে কাটার সময় জাহাজের অভ্যন্তরে উচ্চমাত্রার হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি কীভাবে হলো—এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে শুধু ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ নয়, গ্যাস পরীক্ষা এবং ‘গ্যাস ফ্রি’ সনদ প্রদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি তদারকি কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ৬১ অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান বা যন্ত্রপাতি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে প্রতীয়মান হলে পরিদর্শক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারেন। কোনো স্থাপনা বা যন্ত্রপাতির ব্যবহার আশু বিপজ্জনক হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো—
ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে দুর্ঘটনার আগে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছিল কি?
কোনো পরিদর্শন হয়েছিল কি?
কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি?
নিরাপত্তা ঘাটতি থাকলে তা সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি?
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই প্রয়োজন। কারণ দুর্ঘটনার পর তদন্ত শুধু মৃত্যুর কারণ খুঁজবে না; বরং দুর্ঘটনার আগে রাষ্ট্রীয় তদারকি ব্যবস্থা কোথায় ছিল, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে।
শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডে শ্রমিকের কণ্ঠ কোথায়?
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির সঙ্গে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নেও বোর্ডের দায়িত্ব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—এই খাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশীজন শ্রমিকদেরই বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি নেই বলে শ্রমিক পক্ষের অভিযোগ রয়েছে।
যে শ্রমিক প্রতিদিন জাহাজের ট্যাংকে প্রবেশ করেন, বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন, ভারী লোহার নিচে কাজ করেন, বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মোকাবিলা করেন—তার বাস্তব অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে কেন থাকবে না?
শ্রমিকের কণ্ঠ ছাড়া শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর নীতি তৈরি করা কঠিন।
কিশোর শ্রমিক ব্যবহারের অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে
নিহতদের তালিকায় মতিউর রহমানের বয়স নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে—তালিকায় ১৯ বছর উল্লেখ থাকলেও প্রতিবেদনের অন্য অংশে তার বয়স ১৭ বছর বলা হয়েছে। এই অসঙ্গতিটি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। যদি তার বয়স সত্যিই ১৭ বছর হয়ে থাকে, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ কাটার কাজে কিশোর শ্রমিক কীভাবে নিয়োজিত হলো, কে তাকে নিয়োগ দিল এবং বয়স যাচাইয়ের দায়িত্ব কার ছিল—এসব প্রশ্নও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।
শুধু অপমৃত্যু মামলা কি যথেষ্ট?
প্রথম নয়জন শ্রমিকের একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ অপমৃত্যু মামলা করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু এত বড় শিল্প দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু অপমৃত্যু মামলা করেই তদন্তের দায়িত্ব শেষ করা যায় কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন, অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি এবং কারও অপরাধমূলক দায় ছিল কি না—এসব নির্ধারণে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন।
একইভাবে প্রথম দিন নিহত ৯ শ্রমিকের মধ্যে ৮ জনের ময়নাতদন্ত না করার বিষয়টিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিষাক্ত গ্যাসে একযোগে নয়জনের মৃত্যুর মতো ঘটনায় মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ ও ভবিষ্যৎ তদন্তের স্বার্থে ময়নাতদন্ত না করার সিদ্ধান্তের আইনি ও চিকিৎসাগত ভিত্তি কী ছিল—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা করতে হবে।
কারা দায়ী—তা তদন্তেই নির্ধারিত হোক
এই মুহূর্তে কাউকে চূড়ান্তভাবে দায়ী ঘোষণা না করে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা জরুরি।
তদন্তে অন্তত ইয়ার্ড মালিক ও ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, সেফটি বিভাগ, সেফটি ইঞ্জিনিয়ার, সুপারভাইজার, গ্যাস পরীক্ষা ও ‘গ্যাস ফ্রি’ সনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড এবং জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যাচাই করা উচিত।
এখন কী করা জরুরি?
ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অবিলম্বে কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থল ও সংশ্লিষ্ট জাহাজের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সংরক্ষণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ও দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
পঞ্চমত, জাহাজের অভ্যন্তরে প্রবেশের আগে বাধ্যতামূলক ও নির্ভরযোগ্য গ্যাস পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, প্রতিটি ইয়ার্ডে প্রশিক্ষিত ও সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রেসকিউ টিম, পর্যাপ্ত অক্সিজেন, শ্বাস-প্রশ্বাসের সুরক্ষা সরঞ্জাম, রেসকিউ হার্নেস ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সপ্তমত, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য প্রশিক্ষিত শ্রমিক ছাড়া কাউকে নিয়োগ করা যাবে না এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
অষ্টমত, উচ্চঝুঁকির ইয়ার্ডগুলোতে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন জোরদার করতে হবে এবং জীবন ও নিরাপত্তার জন্য আশু ঝুঁকি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী কার্যক্রম বন্ধ করার ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
নবমত, বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডে শ্রমিক পক্ষের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার
২০১৫ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ১৪৯ জন শ্রমিকের মৃত্যুকে কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে এই শিল্পের মানবিক বিপর্যয় বোঝা যাবে না। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, সন্তান, স্ত্রী, মা-বাবা এবং নির্ভরশীল মানুষের জীবন।
ফেরদৌস স্টিলের নয়জন শ্রমিকের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। কেউ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, কারও পরিবার ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, কারও সন্তান বাবাকে হারিয়েছে। পরিবারের বক্তব্যে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস ও প্রাথমিক অর্থ প্রদানের কথাও এসেছে। কিন্তু কোনো অর্থই একজন শ্রমিকের জীবন বা একটি পরিবারের হারানো মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারে না।
শেষ কথা
ফেরদৌস স্টিলে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গত এক দশকের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দেখায়, জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা সংকট একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। ২০১৫–২০২৬ সময়কালে ১৪৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু এবং ৩১২ জনের আহত হওয়ার তথ্যই তার বড় প্রমাণ।
এখন প্রশ্ন হলো—আর কতজন শ্রমিকের মৃত্যু হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকরভাবে নড়েচড়ে বসবে?
আর কতটি পরিবারকে স্বজন হারানোর শোক বহন করতে হবে?
জাহাজভাঙা শিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু কোনো শিল্পের অর্থনৈতিক মূল্য কখনোই শ্রমিকের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।
ফেরদৌস স্টিলের ৯ শ্রমিকের মৃত্যু তাই শুধু শোকের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং পুরো জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা।
জীবিকার জন্য আর কোনো শ্রমিককে যেন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কর্মস্থলে যেতে না হয়—এটাই হওয়া উচিত ফেরদৌস স্টিলের ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর পর আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
(লেখকঃ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস পরিচালিত জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্য কেন্দ্রের সমন্বয়ক)