চলমান সংবাদ

চাঁদাবাজি ও হামলায় সংকটে শিপ ব্রেকিং শিল্প, শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী ও ভারী শিল্পের কাঁচামালের প্রধান উৎস শিপ ব্রেকিং শিল্প বর্তমানে বহুমুখী সংকটে পড়েছে। একদিকে গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে রূপান্তরের জন্য শত শত কোটি টাকার অতিরিক্ত বিনিয়োগ, অন্যদিকে চাঁদাবাজি, হামলা, লুটপাট, রাস্তা অবরোধ এবং কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনায় শিল্পটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডের অন্তত সাতটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে সংঘবদ্ধ চক্রের হামলা, চাঁদা দাবি ও দখলচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং নতুন বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

জানা গেছে, সীতাকুণ্ডের বারআউলিয়া থেকে কুমিরা পর্যন্ত এলাকায় অবস্থিত বিওবি শিপ রিসাইক্লার্স, বারাকা শিপব্রেকিং, সাগরিকা শিপব্রেকিং, জনতা শিপব্রেকিং, ফোরস্টার, মেহেরুন শিপব্রেকিং ও টি আর শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে হামলা, মালামালবাহী যানবাহন আটকে চাঁদা দাবি এবং কর্মকর্তাদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিওবি শিপ রিসাইক্লার্সে মালিকপক্ষের গাড়ি আটকে কর্মকর্তাদের মারধর ও চাঁদা দাবি করা হয়। সাগরিকা ও বারাকা শিপ ইয়ার্ডে টিনের বেড়া দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে টি আর শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে শতাধিক দুর্বৃত্ত ঢুকে মালামাল লুটপাট, কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি এবং ইয়ার্ড দখলের চেষ্টা চালায়।

একজন শিপ ব্রেকিং উদ্যোক্তা জানান, একশ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে তাঁদের ইয়ার্ডকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্র রাস্তা বন্ধ করে জাহাজ কাটার কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে এবং নিয়মিত চাঁদা দাবি করছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান পূরণের জন্য প্রতিটি গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এই ব্যয় বহন করতে না পেরে ইতোমধ্যে অনেক ইয়ার্ড কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি ইয়ার্ড চালু রয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলে দেড় শতাধিক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ছিল এবং প্রতি মাসে গড়ে ২৫টি পর্যন্ত পুরোনো জাহাজ ভাঙার জন্য আসত। বর্তমানে জাহাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক ও এই শিল্পনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যও সংকুচিত হয়েছে।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে। গত ২৩ জুন সংগঠনের জরুরি সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

বিওবি শিপ রিসাইক্লার্সের মালিক মো. নুরুন নবী মানিক বলেন, শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন চাঁদাবাজ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

বিএসবিআরএর এক কর্মকর্তা বলেন, সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে পুরো শিপ ব্রেকিং শিল্পকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। নতুন নেতৃত্ব এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের ডিউটি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

দেশের রি-রোলিং শিল্প, নির্মাণ খাত এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই ব্যবসায়ীদের দাবি, দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা না হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্প আরও গভীর সংকটে পড়বে।