শ্রম আইন সংশোধনী : ট্রেড ইউনিয়ন প্রশ্নে অসামঞ্জস্য ও বৈষম্য -ফজলুল কবির মিন্টু

সংগঠক, টিইউসি, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধনী ২০২৫–২৬-এ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল—অতিরিক্ত সদস্যসমর্থনের শর্ত, প্রশাসনিক জটিলতা এবং মালিকপক্ষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপের কারণে বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সরকার কিছু শর্ত শিথিল করলেও সংশোধনীগুলোর ভেতরে এখনও নানা অসামঞ্জস্য, বৈষম্য এবং নীতিগত প্রশ্ন রয়ে গেছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ২০ জন শ্রমিক একত্র হয়ে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের আকার অনুযায়ী সদস্যসংখ্যার ভিন্ন ভিন্ন সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের তুলনায় এটি কিছুটা সহজীকরণ হলেও বাস্তবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শত শত শ্রমিককে প্রকাশ্যে সংগঠিত করা এখনও অত্যন্ত কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে চাকরি হারানোর আশঙ্কার সম্ভাবনা বিদ্যমান।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে জারিকৃত অধ্যাদেশে একটি প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ পাঁচটি ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ রাখা হলেও পরবর্তী সংশোধনীর মাধ্যমে তা কমিয়ে তিনটিতে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যা কার্যত পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়ার শামিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এ ধরনের সীমাবদ্ধতা প্রতিষ্ঠানের বহুমাত্রিক প্রতিনিধিত্ব এবং শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগকে সংকুচিত করতে পারে। ফলে আইন করে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া সংগঠনের স্বাধীনতার নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলোর মধ্যে আরেকটি আলোচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ বিষয় হচ্ছে শ্রম আইনের ধারা ১৮০ সংশোধনের ধরন। ২০২৫ সালে জারীকৃত শ্রম আইন সংশোধনী অর্ডিন্যান্সের ৩৬ ধারায় বলা হয়েছিল—
“উক্ত আইনের ধারা ১৮০ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (খ) এর প্রান্তস্থিত কোলন চিহ্নের পরিবর্তে দাঁড়ি চিহ্ন প্রতিস্থাপিত হইবে এবং শর্তাংশ বিলুপ্ত হইবে।”
অর্থাৎ তখন শুধু কোলনের জায়গায় দাঁড়ি বসানো নয়, একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট “শর্তাংশ” বিলুপ্ত করার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
কিন্তু ১০ এপ্রিল ২০২৬ সালের সংশোধনীতে এসে দেখা যায়, সেখানে শুধু বলা হয়েছে—
“উক্ত আইনের ধারা ১৮০ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (খ) এর প্রান্তস্থিত কোলন চিহ্নের পরিবর্তে দাঁড়ি চিহ্ন প্রতিস্থাপিত হইবে।”
অর্থাৎ “এবং শর্তাংশ বিলুপ্ত হইবে” — এই অংশটি সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—যদি শর্তাংশ বিলুপ্তই না করা হয়, তাহলে শুধু কোলনের পরিবর্তে দাঁড়ি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল? এই পরিবর্তনের বাস্তব বা আইনগত তাৎপর্য কী? নাকি এটি কেবল একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অসতর্ক সংশোধনী প্রক্রিয়ার উদাহরণ?
বিষয়টি হয়তো এককভাবে খুব বড় কোনো ইস্যু নয়। তথাপি শ্রম আইন সংশোধনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অতীতে যেভাবে উদাসীনতা ও অসতর্কতার পরিচয় পাওয়া গেছে, এবারের সংশোধনীতেও যেন তারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বলে মনে হয়। আর যদি সচেতনভাবেই এটা করা হয়ে থাকে তাহলে এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে যদি কোনো ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটিতে ১০ শতাংশ বহিরাগত নেতৃত্ব রাখার সুযোগ থাকে, তাহলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেই সুযোগ রাখা হবে না কেন?
আইনের এই ভিন্নতা বাস্তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একধরনের বৈষম্য তৈরি করছে কি না, সেটিও আলোচনার দাবি রাখে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি খাতে শ্রমিকদের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। উপরন্তু, অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মালিকপক্ষ ট্রেড ইউনিয়নের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তর থেকে নেতৃত্বে উঠে আসা শ্রমিকদের জন্য চাকরিচ্যুতি, হয়রানি কিংবা কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
এমন বাস্তবতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই বরং সীমিত পরিসরে বহিরাগত অভিজ্ঞ শ্রমিকনেতা, সংগঠক, শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ বা আইনজীবীদের অংশগ্রহণ ট্রেড ইউনিয়নকে আরও কার্যকর, সচল ও স্বাধীনভাবে পরিচালনায় সহায়ক হতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবেও দেখা যায়, পাকিস্তান আমলের Industrial Relations Ordinance, 1969 অনুযায়ী শ্রমিকরা চাইলে প্রতিষ্ঠানের বাইর থেকেও নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারতেন। কিন্তু বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালের পর সেই সুযোগ রহস্যজনকভাবে বাতিল করা হয়। বর্তমানে আবার বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সীমিত পরিসরে বহিরাগত নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ পুনর্বহালের দাবি উঠছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর বহু উদাহরণ রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন আইনে নির্দিষ্ট অনুপাতে বহিরাগত সদস্যকে ইউনিয়নের নির্বাহী পদে রাখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষত অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC), সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (CITU) কিংবা ভারতীয় জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (INTUC)-এর মতো বড় সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাইরের অভিজ্ঞ সংগঠক ও শ্রমিকনেতাদের সম্পৃক্ত করে সংগঠন পরিচালনা করে আসছে। (সূত্রঃ ভারতের Trade Unions Act, 1926–এর ২২ ধারা)
শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য এবং টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত প্রায়শঃ বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় বিশেষ করে বেসরকারি খাতে মালিকপক্ষের চাপ, চাকরিচ্যুতির ভয় এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তর থেকে কার্যকর নেতৃত্ব গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সীমিত আকারে বহিরাগত নেতৃত্বের সুযোগ সংগঠনকে আরও স্বাধীন, কার্যকর ও টেকসই করতে পারে।
একইসঙ্গে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে—যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই, সেখানে ইউনিয়ন গঠনের দায়িত্ব কে নেবে?
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি সামনে আনা প্রয়োজন—
“যে সকল প্রতিষ্ঠানে ইউনিয়ন নেই, সে সকল প্রতিষ্ঠানে ইউনিয়ন গঠন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।” এই মূলনীতির ভিত্তিতে ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনের আইনগত প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকা জরুরি। শ্রম দপ্তরকে শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নয়, বরং শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেও ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রয়োজন হলে ইউনিয়নবিহীন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার জন্য সহায়ক উদ্যোগ, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার বিধানও থাকতে হবে।
তবে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার নামে যেন মালিকপক্ষনির্ভর “পকেট ইউনিয়ন” বা তথাকথিত “হলুদ ইউনিয়ন” সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করে কৃত্রিম ইউনিয়ন তৈরি করা হলে সেটি শ্রমিক আন্দোলনের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড অনুযায়ী সংগঠনের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। বিশেষ করে International Labour Organization-এর কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ অনুযায়ী শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সুতরাং শ্রম আইন সংশোধনকে শুধুমাত্র কিছু শব্দ পরিবর্তন, সদস্যসংখ্যা নির্ধারণ বা প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব কর্মপরিবেশ, প্রতিনিধিত্বের অধিকার, সাংগঠনিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে রেখে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। শ্রম আইন তখনই কার্যকর ও গণতান্ত্রিক হবে, যখন সেটি শুধু নিবন্ধনের প্রক্রিয়া নয়, বরং শ্রমিকদের ভয়ভীতিমুক্তভাবে সংগঠিত হওয়ার বাস্তব অধিকারও নিশ্চিত করতে পারবে।
(লেখকঃ টিইউইসি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক এবং জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্য সচিব)
