চলমান সংবাদ

গবেষণা তহবিল ইউজিসির নিয়ন্ত্রণে: একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ, আপত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে সরকারি বরাদ্দ বিতরণের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গবেষণা তহবিল আর সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হবে না; বরং এ অর্থ কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর মাধ্যমে পরিচালিত ও ব্যয় করা হবে।

এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশের শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন ও শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাঁদের মতে, নতুন ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা সংকুচিত করবে, গবেষণা কার্যক্রমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়াবে এবং গবেষণার গতি কমিয়ে দিতে পারে।

উপাচার্যদের আপত্তি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, গবেষণার অর্থ যদি কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

তিনি বলেন, “হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন গবেষণা করতে পারবেন, কিন্তু নিয়মিত গবেষণা থেমে যাবে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতার পরিপন্থী।”

তিনি জানান, আগামী ৯ জুলাই ইউজিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান তুলে ধরা হবে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর কোষাধ্যক্ষ মো. মতিয়ার রহমান। তাঁদের মতে, আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

কী পরিবর্তন এসেছে

এতদিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক বাজেটের অংশ হিসেবে গবেষণা খাতে পৃথক বরাদ্দ দেওয়া হতো। কিন্তু ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে সেই পদ্ধতি পরিবর্তন করে গবেষণা তহবিল কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির অধীনে নেওয়া হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে ২১ কোটি টাকা পেয়েছিল। কিন্তু নতুন অর্থবছরে একই খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। পরিবর্তে গবেষণা প্রকল্পের অর্থ ইউজিসির মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।

সরকারের ব্যাখ্যা

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শারমিনা নাসরীন বলেন, এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। গবেষণা অনুদান বন্ধ করা হয়নি; কেবল বরাদ্দ দেওয়ার পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি জানান, সিদ্ধান্তটি পরীক্ষামূলকও হতে পারে এবং ভবিষ্যতে এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে।

অন্যদিকে ইউজিসি জানিয়েছে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার জন্য মোট ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি

ইউজিসির দাবি, নতুন ব্যবস্থায় গবেষণা অর্থায়ন আরও সহজ, স্বচ্ছ ও গবেষকবান্ধব হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা বা গবেষণার বিষয়ভিত্তিক বৈচিত্র্য ক্ষুণ্ন হবে না।

পড়ুন:  অনার্স থেকে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বাদ দেওয়ার খবর ভিত্তিহীন: শিক্ষামন্ত্রী

এ লক্ষ্যে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা পরিকল্পনা, উপখাতভিত্তিক অর্থের চাহিদা এবং বাজেট প্রাক্কলন কমিশনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেন এই সিদ্ধান্ত

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বরাদ্দ যথাযথভাবে ব্যবহৃত না হওয়ার অভিযোগ এবং অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সরকার গবেষণা তহবিল কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইউজিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তেই এ পরিবর্তন এসেছে। যদিও ইউজিসির মধ্যেও এ দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি ছিল। তবে কমিশন সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে বলে তিনি জানান।

শিক্ষকদের উদ্বেগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য সামিনা লুৎফা বলেন, শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের দাবি করা হলেও গবেষণা বরাদ্দ কেন কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, সেটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. ইলিয়াছ হোসাইন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গবেষণা মূল্যায়ন কাঠামো রয়েছে। সেখানে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞরা প্রকল্প যাচাই করেন। কেন্দ্রীয়ভাবে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একই মানের মূল্যায়ন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

গবেষণায় বাংলাদেশের অগ্রগতি

বিতর্কের মধ্যেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

Scopus-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্কোপাস-ইনডেক্সড গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে গবেষণা প্রকাশনা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালে Stanford University এবং Elsevier প্রকাশিত বিশ্বসেরা গবেষকদের তালিকায় বাংলাদেশের ৩৫ জন গবেষক স্থান পান, যাঁদের সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

সম্প্রতি Asian Scientist-এর এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায়ও বাংলাদেশের তিনজন বিজ্ঞানী স্থান পেয়েছেন।

বিশেষজ্ঞের মত

ইলিশ ও পাটের জিনরহস্য উন্মোচনকারী গবেষণার অন্যতম নেতৃত্বদানকারী বিজ্ঞানী হাসিনা খান মনে করেন, যদি নতুন ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়ে থাকে, তাহলে এর ফলাফল মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বিদ্যমান একাডেমিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

গবেষণা অর্থায়নের নতুন এই নীতি কার্যকর হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি এবং সরকারের মধ্যে আলোচনা কোন দিকে গড়ায়, তা এখন উচ্চশিক্ষা অঙ্গনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।