মতামত

সিএসআর, গণভোট ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন

-ফজলুল কবির মিন্টু

ফজলুল কবির মিন্টু
সংগঠক, টিইউসি, কেন্দ্রীয় কমিটি

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) তহবিল ব্যবহার করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশনা ইতোমধ্যেই জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি মূলত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহের সামাজিক দায়বদ্ধতা। সামাজিক দায়বদ্ধতা বলতে সাধারণভাবে বোঝায় সমাজের পিছিয়ে পড়া, বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগে সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এই ধরনের কাজই সিএসআরের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, আমাদের দেশে সিএসআর অনেক ক্ষেত্রেই লোক দেখানো কাজে সীমাবদ্ধ। রাস্তার ডিভাইডারে কিছু ফুলগাছ লাগানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কয়েকটি বাস দেওয়া, বা মাঝেমধ্যে সীমিত পরিসরে ত্রাণ বিতরণ—এসবই যেন সিএসআরের প্রধান কাজ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক খাতে সিএসআরের কার্যকর ব্যবহার খুবই সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত সিএসআর তহবিল ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে—অর্থাৎ গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে—প্রচারণা চালানো কি আদৌ নৈতিক ও আইনসম্মত? সিএসআরের মূল দর্শনের সঙ্গে এর কি কোনো সামঞ্জস্য আছে? অনেকের মতে, এটি সিএসআরের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

অন্যদিকে, এই গণভোটের পেছনের রাজনৈতিক বাস্তবতাও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, এই সরকার নিরপেক্ষভাবে দেশ পরিচালনা করবে এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করবে। কিন্তু শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সরকারের মতো আচরণ করতে শুরু করে, যা মানুষের প্রত্যাশাকে ধাক্কা দেয়।

পড়ুন:  চার প্রশ্নে এক ভোট—গণভোট নয়, গণমতের বিকৃতি -ফজলুল কবির মিন্টু

অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং এর মধ্যে ৬টি কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঐক্যমত্য গঠনের জন্য একটি ঐক্যমত্য কমিশনও গঠন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ঐক্যমত্য কমিশন ঐক্য প্রতিষ্ঠায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অনৈক্যের মধ্য দিয়েই “জুলাই সনদ” ঘোষণা করা হয়, যা জনমনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

এই পরিস্থিতিতে ধারণা করা হচ্ছে, সরকার নিজেই নিশ্চিত নয় যে গণভোটে জুলাই সনদের পক্ষে রায় আসবে কি না। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সরকারের প্রায় সবাই প্রকাশ্যে “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এতে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এই গণভোট আদৌ কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হবে?

যে সরকারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নিরপেক্ষতা, সেই সরকারই যখন একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়, তখন পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়। তার ওপর আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সিএসআর তহবিল ব্যবহার করে একই অবস্থানের পক্ষে প্রচারণা চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হলে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনগণের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার এবং নিরপেক্ষ পরিবেশে সেই মত প্রকাশের সুযোগ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবিধানিক দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান যদি কোনো একপক্ষের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

সিএসআর দরিদ্র, অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণের জন্য—রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য নয়। আর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, কোনো একটি মতকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে এগিয়ে দেওয়া নয়। এই দুই জায়গায় যে বিচ্যুতি ঘটছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।
(লেখকঃ সংগঠক, টিইউসি, কেন্দ্রীয় কমিটি)