বিজন ভাবনা (৬৬): চার মূলনীতির অন্তরালে -বিজন সাহা
![]()
কয়েক দিন আগে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্কাফি রতন বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন ফেসবুকে। এর মূল বক্তব্য ছিল চার মূলনীতি প্রশ্নে সিপিবি আপোষ করবে না। সাথে ছিল সমকালে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ। সেখানে বারবার “চার মূলনীতি” বলা হলেও খোলসা করে “জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা” শব্দগুলো বলা হয়নি। স্ট্যাটাস নিয়ে কোনই আপত্তি ছিল না, বরং অনেক দিন পরে বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে এমন এক স্ট্যাটাস দেখে খুশিই হয়েছিলাম। তবে “জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা” শব্দমালাকে “চার মূলনীতির” হিজাব বা বোরকা পরিয়ে প্রকাশ মনে ধরেনি। তাই লিখলাম “জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা – এসব কি ভাসুর নাকি যে নাম নেয়া যাবে না?” বলাই বাহুল্য যে কমরেডদের সেটা পছন্দ হয়নি, ফলে কেন এই কমেন্ট করলাম সেটা বোঝার চেষ্টা না করে বিভিন্ন ভাবে তারা বলার চেষ্টা করেছে যে চার মুলনীতি বলতে কি বোঝায় সেটা সবই জানে। আর আমার যদি না জানা থাকে তবে যেন কষ্ট করে জেনে নেই। রতন নিজে লিখল যে তার দেড় ঘণ্টার সাক্ষাৎকার দেখলে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। আমার ধারণা ঘর পোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়, তেমনি কমরেডদের অনেকেই আমার কমেন্টে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়েছে আর কেন লিখলাম সেটা বোঝার চেষ্টা না করে অন্ধভাবে এর বিরোধিতা করার চেষ্টা করেছে। বিরোধিতা করতেই পারে, তাতে সমস্যা নেই। তবে বিরোধিতা অন্ধ হলে সমস্যা, যতটা না আমার তারচেয়ে বেশি তাদের। কারণ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা সেই শব্দগুলো বেশি বেশি করে উচ্চারণ করা একান্তই আবশ্যক। শুধু প্রয়োজন নয়, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতা। এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ? যখন সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দেবার জন্য ষড়যন্ত্রের অভাব নেই তখন এই শব্দটি উচ্চারণ করা মানে অনেক কিছু। না করা মানে পরোক্ষভাবে সেটা এড়িয়ে যাওয়া, মৌলবাদীদের ছাড় দেয়া। একই কথা বলা যায় সমাজতন্ত্র সম্পর্কে। যারা বলে চার মূলনীতির মধ্যেই সব আছে, চার মূলনীতি বললেই জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা বলা হয় তাদের এক গল্প শোনাই।
এক শহরে এক প্রৌঢ় দম্পতি বাস করেন। দীর্ঘ দিন যাবত বিবাহিত এই দম্পতির জীবনে যেমন সুখ আছে, তেমনি আছে দুঃখ। প্রেমে বিরহে, দুঃখে আনন্দে কাটে তাদের জীবন। এক গ্রীষ্মে তাদের বাড়িতে প্রিয় নাতি বেড়াতে এল। আর নাতি অবাক হয়ে দেখল কী আনন্দে, কী দুঃখে, কী প্রেমে, কী ঝগড়ায় – দাদা দাদীকে সবসময় প্রিয়তমা, সুইট হার্ট এসব বলে সম্বোধন করে। স্কুল পড়ুয়া নাতি কিছুতেই শুভঙ্করের ফাঁকিটা ধরতে না পেরে এক দিন দাদাকে জিজ্ঞেস করে বসল
– দাদা, তুমি দাদীকে সবসময় প্রিয়তমা, সুইট হার্ট, আমার রানী এসব বলে ডাক। আবার তোমরা প্রায়ই ঝগড়াও কর। দাদীও তোমাকে কটু কথা বলে। তারপরেও তুমি তাকে এখনও এত ভালোবাস?
– কী করব বল? সত্যি বলতে কি আমি বছর পঁচিশ আগে তোর দাদীর নাম ভুলে গেছি। যদি জানতে পারে তাহলে আর আস্ত রাখবে না। তাই প্রিয়তমা, সুইট হার্ট, আমার রানী এসব বলেই নিজের প্রাণ বাঁচাই আর সংসার রক্ষা করি।
গালভরা শব্দ জানা ভালো, তবে আরও ভালো এসব শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ জানা। কারণ আমাদের দেশে আজকাল কথায় কথায় ফ্যাসিবাদ থেকে শুরু করে যেসব রাজনৈতিক শব্দ চয়ন করা হয় তাতে অনেক সময় বুঝতে কষ্ট হয় যে এসব শব্দের ব্যবহার তারা কি অর্থে করছে। একই কথা বলা যায় জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এসব শব্দ খুচরো বিক্রি না করে চার মূলনীতি নামে পাইকারি দরে বিক্রি করলে। কারণ পাইকারি দরে অনেকে অনেক অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনে পয়সা বাঁচাতে, কিন্তু আমাদের এই চার মূলনীতির প্রতিটি পণ্য সমান মুল্যবান, সমান প্রয়োজনীয়। আর এ কারণেই এদের আলাদা আলাদা ভাবে উল্লেখ করা জরুরি। আর এখান থেকেই জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা আলাদা আলাদা ভাবে উচ্চারণ করার এই আহ্বান। যদিও জানি কোন কথা উচ্চারণ করলেই সেটা সত্য হয় না। চব্বিশের আন্দোলনে সারা দেশ “আমার সোনার বাংলা”, “ধনে ধান্যে পুষ্পে ভরা” এসব গান গেয়ে বা “শেখ মুজিবের বাংলাদেশে স্বৈরাচারের ঠাই নাই” স্লোগান দিয়ে মাঠে নেমেছিল, কিন্তু একবার ক্ষমতার স্বাদ পেতেই দেখা গেল এখানে শেখ মুজিব, রাবীন্দ্রনাথ এদেরই ঠাই মিলছে না।
কথায় বলে বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়। তাই যদি হয় তবে জুলাই অভ্যুত্থানের ফলাফল দেখে মনে হয় আমরা আপদ তাড়িয়ে বিপদ ডেকে এনেছি। সার্বিক ভাবেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। যদি তাই হয় সে ব্যাপারে সিপিবির মূল্যায়ন কি? তবে মাঝে মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে অনেকের অতি উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয় তারা এখনও আওয়ামী ভূতের বিরুদ্ধেই লড়াই করে যাচ্ছে। মার্ক্স ও এঙ্গেলস কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো শুরু করেছিলেন এ ভাবে – ইউরোপ ভূত দেখেছে, কমিউনিজমের ভূত। সব দেখে বলতে ইচ্ছে করে – সিপিবি ভূত দেখেছে, আওয়ামী লীগের ভূত।
প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি সংগঠন কোন না কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কাজে নামে। কখনও সে সফল হয়, কখনও বা ব্যর্থ। কখনও আংশিক ফলাফল লাভ করে, কখনও ঘটনা তাকে একেবারেই উল্টো দিকে নিয়ে যায়। আর সেই ফলাফলের ভিত্তিতে সে তার কাজের সার্বিক মূল্যায়ন করে। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে চব্বিশের আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার দরকার ছিল। আর সেটার মূল লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্ত করা। কিন্তু বিগত সময়ে আমরা কি এই লক্ষ্যে এক কদমও অগ্রসর হতে পেরেছি? কি আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, কী আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের অবস্থার ও অবস্থানের ক্রম অবনতি ঘটছে। আইন শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়েছে। যে সাধারণ মানুষের রাজনীতি সিপিবি করে সেই সাধারণ মানুষের অবস্থা দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। কেন এমন হল? কোথায় ভুল ছিল? এসব নিয়ে পার্টি কি আদৌ কোন পর্যালোচনা করেছে? পার্টির অনেকের বক্তব্য শুনলে সেটা মনে হয় না। বরং মনে হয় চব্বিশের ঘটনাবলীকে তারা সফল বিপ্লব বলেই মনে করে। তাহলে আবার বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে এত কথা কেন? বাহাত্তরের সংবিধান বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, তা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রতিফলন, বিজয়ের ফসল। চব্বিশ আর একাত্তর পরস্পরবিরোধী। একাত্তর যেখানে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপরীতে এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল, সেখানে চব্বিশ সেটাকে ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াশ চালাচ্ছে। এই যে পদে পদে চব্বিশ একাত্তরের বিরোধিতা করছে তাহলে একই সাথে একাত্তর ও চব্বিশকে ধারণ করা দ্বিচারিতা নয় কি?
আমার কমেন্টের উত্তরে অনেকেই বারবার আওয়ামী লীগের কথা টেনে এনেছে। এটা আমার সেই কানার কথা মনে করিয়ে দেয় যার কাঁধে সবাই নিজের ব্যর্থতা চাপাতে চায়। কানাই যদি সব করে তাহলে অন্যদের দরকার কি? একথা সর্বজনস্বীকৃত যে পাকিস্তানের অস্তিত্বের মুলে রয়েছে ভারত বিরোধিতা। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালে মনে হয় ডান বাম সবার অস্তিত্বের মুলে রয়েছে ভারত আর আওয়ামী বিরোধিতা। কথায় কথায় আওয়ামী স্বৈরাচার বলা নিজেদের শক্তি নয়, দুর্বলতার পরিচয়। এটা অজুহাত। অজুহাত দিয়ে দায় এড়ানো যায়, কিন্তু নিজেকে উৎকৃষ্ট করা যায় না। আর নিজেকে যদি উৎকৃষ্ট করতে না পারি তাহলে কমিউনিস্ট হব কীভাবে? মেহনতি মানুষের জন্য একটি শোষণ মুক্ত সমাজ গড়ার আন্দোলন যদি কারও বিরোধিতা করে সেটা সবার আগে সাম্রাজ্যবাদ আর ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে করবে, সেটাই স্বাভাবিক। আর যদি তা না করে বিভিন্ন অজুহাত খোঁজে তাহলে তাদের নাম ও কামের (কাজের) সঙ্গতি নিয়ে মানুষ প্রশ্ন করবেই। আওয়ামী বা শিবির স্টাইলে হামলে পড়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না। তেমন চেষ্টা তাদের মৌলবাদের পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো