যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–১৫: ফজলুল কবির মিন্টু

দীর্ঘ ১৩ মাসের অপেক্ষার অবসান: তৃষ্ণা দেবীর মুখে হাসি

ঘটনাকাল: জানুয়ারি ২০২৩

৪ জানুয়ারি ২০২৩। অন্য একটি কাজে ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম, এক নারী শ্রমিক আমার পা ছুঁয়ে সালাম করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কী হয়েছে জানতে চাইতেই তাঁর কান্না যেন আরও বেড়ে গেল। কিছুতেই তাঁকে শান্ত করতে পারছিলাম না।

একটু সময় নিয়ে তাঁকে শান্ত করলাম। তারপর জানতে চাইলাম, কী তাঁর কষ্ট? কেন এই কান্না?

নারী শ্রমিকটির নাম তৃষ্ণা দেবী। তাঁর কষ্টের কথা শুনে মনটা ভারী হয়ে গেল।

আজিম গ্রুপের পরিচালনাধীন অর্কিড সোয়েটার কারখানায় টানা ১৬ বছরেরও বেশি সময় চাকরি করেছেন তিনি। ২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। কিন্তু চাকরি ছাড়ার পরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে, তবু তিনি তাঁর চূড়ান্ত পাওনা বুঝে পাননি।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ৩০ এবং ১২৩(২) ধারা অনুযায়ী, চাকরি অবসানের পর প্রাপ্য মজুরি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ তৃষ্ণা দেবীর ক্ষেত্রে সেই আইনি বাধ্যবাধকতার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল না।

চাকরি ছাড়ার পর থেকে প্রায় প্রতি মাসেই অন্তত একবার অর্কিড সোয়েটার কারখানার গেটে গেছেন তিনি। কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের ন্যায্য পাওনা চেয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাঁকে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, মালিকের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়, তাই এখন টাকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কিন্তু মালিকের আর্থিক সংকটের দায় একজন শ্রমিক কেন বহন করবেন? ষোল বছরেরও বেশি সময় শ্রম দিয়ে যে মানুষটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও অগ্রগতিতে অবদান রেখেছেন, চাকরি ছাড়ার পর নিজের ন্যায্য পাওনা পেতে তাঁকে মাসের পর মাস ঘুরতে হবে কেন?

তৃষ্ণা দেবী তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনেছিলেন, বিলস অফিসে গেলে হয়তো তাঁর পাওনা আদায়ের একটা ব্যবস্থা হবে। সেই আশাতেই তিনি আমার কাছে এসেছিলেন। তাঁর চোখের জল আর অসহায়ত্বের কথা শুনে মনে হলো, এ শুধু একজন শ্রমিকের পাওনা আদায়ের লড়াই নয়; এ একজন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই।

আমরা তাঁর পাশে দাঁড়ালাম।

তৃষ্ণা দেবীর বঞ্চনা ও হয়রানির বিষয়টি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অর্কিড সোয়েটার শ্রমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলো। গ্রিভ্যান্স দরখাস্ত দিয়েও পাওনা আদায়ের দাবি উত্থাপন করা হলো।

শুরু হলো আরেকটি লড়াই। লক্ষ্য একটাই—তৃষ্ণা দেবী তাঁর ন্যায্য পাওনা বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত এই লড়াই থামবে না।

অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান!

চাকরি ছাড়ার পর কেটে গেছে প্রায় ১৩ মাস। অবশেষে ১৮ জানুয়ারি ২০২৩, একটু আগে তৃষ্ণা দেবী ফোন করলেন। আনন্দে আত্মহারা কণ্ঠে জানালেন, তিনি তাঁর বকেয়া পাওনা হিসেবে ৮১ হাজার ১৪৫ টাকা পেয়েছেন।

দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা আর হয়রানির অবসান ঘটেছে। নিজের ন্যায্য পাওনা হাতে পেয়ে তৃষ্ণা দেবী যেন নতুন করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

খুশিতে আটখানা তৃষ্ণা দেবী এবার জানতে চাইলেন, আমি কী খেতে চাই! আমার জন্য কী করলে আমি খুশি হব!

তাঁকে কীভাবে বোঝাই, তৃষ্ণাদের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একজন শ্রমিক তাঁর ন্যায্য অধিকার ফিরে পেয়েছেন—এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে!

আমরা তো কোনো ব্যক্তিগত প্রাপ্তির আশায় শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াই না। আমাদের আনন্দ তাঁদের চোখের জল মুছে যাওয়ায়, তাঁদের মুখে হাসি ফোটায়। তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই আমাদের কাজের সার্থকতা।

আমরা বিশ্বাস করি, শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁর অধিকার। আর সেই অধিকার আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।

বাঘে ধরলে ছাড়তেও পারে, কিন্তু আমরা ধরলে ছাড়ি না!

হ্যাঁ, আমরা ছাড়ি না, ভবিষ্যতেও ছাড়ব না। যত দিন একজন শ্রমিক তাঁর ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত থাকবেন, যত দিন অধিকার আদায়ের জন্য তাঁকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে, তত দিন আমাদের এই লড়াই চলবে।

তৃষ্ণা দেবীর পাওনা আদায়ের এই সাফল্য আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সামনে আরও অনেক তৃষ্ণা দেবী আছেন—যাঁদের বঞ্চনার গল্প হয়তো কোথাও লেখা হয় না, যাঁদের কান্না শোনারও কেউ থাকে না। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই, তাঁদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সঙ্গী হতে চাই।

ভবিষ্যতেও যেন বঞ্চিত ও নিপীড়িত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে পারি, সে জন্য সবার দোয়া, সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করছি।