চট্টগ্রাম বন্দরে খালি কন্টেনারে কোটি টাকার ‘ভুয়া রপ্তানি’

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও রপ্তানি প্রণোদনা আত্মসাতের অভিযোগ
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানির ঘোষণা দিয়ে খালি কন্টেনার বিদেশে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তব পণ্যের পরিমাণের মিল নেই, আবার কোথাও কাগজে কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি দেখানো হলেও কন্টেনারে কোনো পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, আইসিডি এবং সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের যোগসাজশে এ ধরনের কারসাজি চলছে। এর মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত আমদানি করা কাপড় ও কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে রপ্তানি প্রণোদনা ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের আড়ালে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি ভ্যালমন্ট ফ্যাশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের চালান আটকের পর বিষয়টি সামনে আসে। প্রতিষ্ঠানটি ১২১ টন পণ্য রপ্তানির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সরেজমিন পরিদর্শনে কন্টেনারগুলো খালি পাওয়া যায়। চালানটির ঘোষিত পণ্যমূল্য ছিল প্রায় ৪ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
চালানটি ইছাক ব্রাদার্স নামের একটি ডিপো থেকে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স পেয়েছিল। ফলে খালি কন্টেনার কীভাবে এতগুলো ধাপ পেরিয়ে রপ্তানির পর্যায়ে পৌঁছাল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যেভাবে চলে কারসাজি
সংশ্লিষ্টদের মতে, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদন করে তা বিদেশে রপ্তানি করার শর্ত রয়েছে। কিন্তু একটি চক্র কাঁচামাল বা তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিয়ে পরে কাগজে-কলমে রপ্তানি দেখিয়ে সেই অনিয়ম আড়াল করে।
তৈরি পোশাক সাধারণত কারখানা থেকে আইসিডি বা অফডকে যায়। সেখানে কন্টেনার স্টাফিং, ওজন, সিল ও পরিদর্শনের পর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারের মাধ্যমে কাস্টমস ও শিপিং-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ধাপের তথ্য সমন্বিতভাবে তৈরি করা হলে বাস্তবে পণ্য না থাকলেও কাগজপত্রে চালানটি বৈধ রপ্তানি হিসেবে দেখানো সম্ভব হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিল অব এক্সপোর্ট, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, কন্টেনার নম্বর, বিল অব লেডিং ও ম্যানিফেস্টের তথ্য পরবর্তী ধাপে ব্যবহৃত হয়। ফলে শুরুতেই মিথ্যা তথ্য প্রবেশ করানো হলে সেটি পরবর্তী পর্যায়েও বৈধ তথ্য হিসেবে প্রতিফলিত হতে পারে।
তদন্তের দাবি
গার্মেন্টস খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তার মতে, এ ধরনের ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে। শুধু একটি চালান আটক না করে আইসিডি, কাস্টমস, সিঅ্যান্ডএফ, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার ও ব্যাংকিং লেনদেন—পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের অভিযোগ, একই প্রক্রিয়ায় বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের পাশাপাশি ভুয়া রপ্তানি, রপ্তানি প্রণোদনা আত্মসাৎ এবং ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভ্যালমন্ট ফ্যাশনের ঘটনায় খালি কন্টেনার আটকের বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের বড় কোনো চক্রের অংশ—তা খুঁজে বের করতে পৃথক তদন্ত দল গঠনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।