শোক – উৎপল দত্ত

মৃত্যু অনিবার্য ।
জন্মের পর থেকেই শুরু হয় এই যাত্রা।
একদিন নশ্বর দেহ পৃথিবীর মায়া-মমতা ছেড়ে বিলীন হয় অসীম ব্রক্ষ্মান্ডে।
শরীরের বিলুপ্তি ঘটলেও এই পৃথিবীতে থেকে যায় মানুষের সকল সুকৃতি ।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “ মানুষের মধ্যে দ্বিজত্ব আছে। একবার জন্মগ্রহণ করে মাতৃগর্ভে,
আর একবার জন্মগ্রহণ করে মুক্ত পৃথিবীতে। মানুষের এক জন্ম আপনাকে নিয়ে।
আর এক জন্ম সকলকে নিয়ে।”
দ্বিতীয় জন্মের মধ্যেই মানুষের সকল সার্থকতা ।
দ্বিতীয় জন্ম যে মানুষের হয়েছে তাঁর শরীর বিলীন হলেও তিনি বেঁচে থাকেন সকলের মাঝে।
প্রাক্তন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা, সিপিবি নেতা মোহাম্মদ মুছা ভাইয়ের দ্বিতীয় জন্ম হয়েছিল।
তিনি ছাত্র জীবন থেকে গণ মানুষের কল্যানে কাজ করেছেন ।
শুধুমাত্র নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করেন নি।
যে সময়ে তিনি রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন সেই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ
উপনিবেশের শৃঙ্খল ভেঙ্গে জাতীয় মুক্তির আন্দোলন করছে ।
অন্যদিকে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনয়ন আন্দোলনরত মানুষের পাশে ।
কি বিপুল মানুষের শক্তি । চোখে স্বপ্ন । স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য।
অসংখ্য মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজের।
মোহাম্মদ মুছা ভাই ও ছিলেন তাঁদের একজন।
বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে, কৃষক-খেতমজুরের মধ্যে চেয়েছিলেন সেই স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে।
গ্রামে গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোন ধরণের মোহ
তাঁর জীবন কালিমা লিপ্ত করতে পারেনি।
আজীবন বিপ্লবী মোহাম্মদ মুছা লাল সালাম।
তিনি বেঁচে থাকবেন সকলের মাঝে।
আমার কবিতা তাঁর বিপ্লবী স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদন করলাম।
হে বংশীবাদক, হে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
……………………
গভীর রাতের নৈশব্দ ভেঙ্গে সদ্য ভূমিষ্ট শিশুর কান্না
হাসপাতালের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তোলে ।
পাশের রুমে শুয়ে আছো তুমি পক্ক কেশ,
জীবনের চলার পথে সাদাকেই নিয়েছিলে সাথে
সফেদ পাজামা পাঞ্জাবী ছিল তোমার প্রিয় পোষাক;
আজও এই সাদা দেয়াল ঘেরা ঘরে
তোমার মুখ ঢেকেছো সাদা কাপড়ে ।
কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে কি রাখতে তুমি?
প্রিয় বাঁশের বাঁশি কি ?
তোমার বাঁশির সুরে মাতাল হতো হাওয়া,
সুরের আবেশে পাখি গাইতো গান
নদীর জলে জলতরঙ্গ করতো খেলা
আকাশ জুড়ে রংধনু ছড়াতো সাত রঙ।
তুমি ছিলে হ্যামিলনের বংশীবাদক,
তোমার সুরে ছিল জীবনের কথা;
তুমি ছিলে স্বপ্নাচারী,
সেই স্বপ্নের কথাই তুমি বলতে বাঁশির সুরে,
হাজার-নিযুত কিশোর- যুবক
তোমার সুরে ঘর ছেড়ে নেমেছে পথে।
তুমি বাঁশি নিয়ে হেঁটে গেছো
সোনালী শষ্যের মাঠে
কৃষকের কানে কানে শুনিয়েছো
তোমার স্বপ্নের কথা, নব জীবনের কথা
তুমি হেঁটে গেছো দিগন্তের পানে
পথে পথে ছড়িয়েছো নতুন সূর্যের আলো,
পথের মানুষ জেনেছে তাদের হারাবার কিছু নেই
পাওয়ার জন্য আছে ভোরের সোনালী কুসুম ।
আজ যে শিশু জন্ম নিয়েছে নিশ্চয় তার কানে কানে
বলেছ স্বপ্নের কথা, বাঁশির সুরে জীবনের গল্প ।
হে বংশীবাদক, হে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
এ’ শিশু একদিন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে
পথে পথে ছড়িয়ে দেবে তোমার স্বপ্নের বীজ
ফলাবে আগামী দিনের সোনালী শস্য।।
(প্রাক্তন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মোহাম্মদ মুছার প্রয়াণ দিবস ২০ আগস্ট । ২০২০ সালে তিনি মৃত্যু বরণ করছেন । তাঁর স্মৃতি স্মরণ করে এই লেখা।)