চলমান সংবাদ

ভাটিয়ারীতে স্ক্র্যাপ জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু, আহত ১০-এর বেশি

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে স্ক্র্যাপ জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজের ঘটনায় সেফটি ইনচার্জসহ ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ১০ জনের বেশি। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ইয়ার্ডে থাকা ‘এলএনজি’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজে এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, জাহাজটির একটি ট্যাংকে গ্যাস লিকেজের পর দ্রুত বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে সেখানে কাজ করা শ্রমিকরা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন।

ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন। আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়। উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও অংশ নেন।

চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা হলেন সীতাকুণ্ডের আকবর আলী হাটের মোহাম্মদ সেকান্দরের ছেলে দুই ভাই মোহাম্মদ মনসুর (৫৫) ও মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন (৫১), পাবনার সুজানগর ছৈয়দপুরের মোহাম্মদ আলীর ছেলে মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সুজন (৩৬), গাইবান্ধা সদরের উত্তর কুপতলার মোহাম্মদ হারুন মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ রানা মিয়া (২৩), সীতাকুণ্ডের খাদেমপাড়ার আবদুল মালেকের ছেলে হাবিবুর রহমান (৫১), ভাটিয়ারীর শনি ঠাকুরপাড়ার হরেন্দ্র দাশের ছেলে পলাশ দাশ (৩৫), একই এলাকার প্রদীপ দাশের ছেলে সানি দাশ (২৩), গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ কিমাত হলুদিয়া এলাকার মোহাম্মদ রানা মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ খোকন মিয়া (২৩) এবং সীতাকুণ্ডের মতিউর রহমান (১৯)।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিহত নয়জনের মধ্যে একজনের ময়নাতদন্ত হয়েছে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই অন্যদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আব্দুল্লা আল মামুন বলেন, সকাল ৯টার দিকে খবর পেয়ে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস ও কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত তিনজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আহতদের ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠায়।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, স্ক্র্যাপ জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজ হয়ে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

তবে নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ থাকার কথা থাকলেও সেখানে অন্য দিনের মতো কাজ চলছিল। দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধারে বিলম্ব হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এমনকি ইয়ার্ডের গেট সময়মতো খুলে না দেওয়ায় গেটের সামনে কয়েকজন আহত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন স্বজনরা।

অন্যদিকে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ দাবি করেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। সকাল ৯টার দিকে এলএনজি জাহাজের একটি ট্যাংকে লিকেজের খবর পেয়ে স্থানীয় ও বহিরাগত কিছু লোক ঘটনাস্থলে আসে। এরপর কয়েকজনের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে আহত ও নিহতদের সংখ্যা এবং পরিচয় তিনি জানাতে পারেননি।

ঘটনার পর চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম, ওসি মহিনুল ইসলাম, পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীরসহ র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

এদিকে দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতা ইয়ার্ডে ভাঙচুর করেছে বলে দাবি করেছে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ।

৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি

ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের দুর্ঘটনা তদন্তে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক এবং সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সদস্যসচিব করা হয়েছে।

কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রতিনিধিরা।

তদন্তের স্বার্থে কমিটি প্রয়োজনে এক বা একাধিক সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে। দুর্ঘটনার উৎস ও কারণ উদঘাটন, এর পেছনে ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়দায়িত্ব আছে কি না তা নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশসহ সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

শিপইয়ার্ড খাত নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা একটি সংস্থার মতে, এ দুর্ঘটনা অত্যন্ত ভয়াবহ। গত ২৫ বছরের ইতিহাসে কোনো একটি শিপইয়ার্ডে একসঙ্গে এত শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা নজিরবিহীন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ফেরদৌস স্টিল একটি ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে স্বীকৃত হলেও শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। বারবার নোটিশ, পরিদর্শন ও নির্দেশনা দেওয়ার পরও যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কি না, তদন্তে সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং শ্রমিকদের কর্মপরিবেশে দায়িত্বশীলদের কোনো অবহেলা ছিল কি না—তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।