চলমান সংবাদ

মির্জা ফখরুলই হতে যাচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই ছাত্ররাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে রাজনৈতিক মামলায় কারাগারেও যেতে হয়েছিল তাঁকে। স্বাধীনতার পর শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে সেই পেশা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জেলা বিএনপির সভাপতি, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিবসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। একই সঙ্গে পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।

এবার দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। জাতীয় সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাঁর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত। ইতিমধ্যে বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে বঙ্গভবনে উঠবেন মির্জা ফখরুল।

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার খবরে উচ্ছ্বসিত তাঁর বন্ধু ও ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে। তিনি বলেন, তাঁর বন্ধু রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করবেন—এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত গর্বের বিষয় নয়, পুরো দেশবাসীর জন্যও গর্বের। তবে রাষ্ট্রপতি হলে ঠাকুরগাঁওবাসী তাঁর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত হবেন—এ ভাবনায় কিছুটা মন খারাপ তাঁর। একই সঙ্গে এলাকায় মির্জা ফখরুলের হাত ধরে যে উন্নয়নের ধারা তৈরি হয়েছে, তা যেন অব্যাহত থাকে—এ প্রত্যাশাও তাঁর।

জন্ম, বেড়ে ওঠা ও ছাত্ররাজনীতি

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের একাধিকবারের সংসদ সদস্য এবং পরে এরশাদ সরকারের মন্ত্রী। মা মির্জা ফাতেমা আমিন।

ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন মির্জা ফখরুল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ওই সময় তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়।

শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগের পর আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান তিনি। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে কর্মরত থাকার সময় সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং ইউনেসকো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন।

সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ

১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হন। পরের বছর ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকারে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। ২০১১ সালের মার্চে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন।

২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এর পরই তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হলো।

পারিবারিক জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ঢাকার একটি বিমা কোম্পানিতে কর্মরত। তাঁদের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন এবং পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বিএনপি সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ সুবিধা তদারকির জন্য গঠিত যুব শিবির অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নে তাঁরা আনন্দিত। অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি দেশের জন্য কাজ করবেন—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।