৫ হাজার কোটি টাকার ফ্লাইওভার-এক্সপ্রেসওয়ে ‘ভুল পরিকল্পনা’, স্বীকার করল সিডিএ – দেড় দশকে নির্মিত উড়াল অবকাঠামো যানজট কমাতে ব্যর্থ; খসড়া মহাপরিকল্পনায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা

চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে গত দেড় দশকে নির্মিত প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েকে নিজেদের ‘ভুল পরিকল্পনা’ হিসেবে স্বীকার করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংস্থাটির খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ নগরীর যানজট কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
সিডিএর নথি অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরে চারটি ফ্লাইওভার, একটি ওভারপাস এবং একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ২৩৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার, কদমতলী ফ্লাইওভার, মুরাদপুর-লালখানবাজার ফ্লাইওভার, দেওয়ানহাট ওভারপাস এবং লালখানবাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।
খসড়া ‘স্ট্রাকচার প্ল্যান রিপোর্ট’ ও ‘ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, অতীতে অনুমোদিত মূল পরিকল্পনা নথিতে এসব ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়ের কোনো প্রস্তাব ছিল না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যানজট নিরসনে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও সে পথে না গিয়ে উড়াল সড়ক নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে।
মাস্টারপ্ল্যানে আরও বলা হয়েছে, সড়ক প্রশস্তকরণ ও মোড় উন্নয়নের মতো কিছু ভৌত অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। চট্টগ্রাম ট্রাফিক কমিটি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ট্রাফিক কমিটি কিংবা পৃথক পাবলিক ট্রান্সপোর্ট গ্রুপ গঠনের মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নগরীর সড়কে এখনো কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, নগর পরিকল্পনা একটি কারিগরি বিষয় হলেও অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যার সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। খসড়া মহাপরিকল্পনার তথ্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
পরিকল্পনাগত ভুলের বিষয়টি স্বীকার করে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, অতীতের অনেক প্রকল্প রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। নতুন মহাপরিকল্পনার আলোকে যেসব ক্ষেত্রে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
২০১০ সালের ২ জানুয়ারি বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে উড়াল সড়ক যুগের সূচনা হয়। তবে শুরু থেকেই নগর পরিকল্পনাবিদরা যথাযথ সমীক্ষা ছাড়া এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরোধিতা করে আসছিলেন। সর্বশেষ প্রকাশিত মহাপরিকল্পনায় সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন ঘটেছে।
