চলমান সংবাদ

প্রবল বর্ষণে কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধস: রোহিঙ্গাসহ ১০ জনের মৃত্যু, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছাড়ার আহ্বান

কক্সবাজার, প্রতিনিধি: টানা ভারী বর্ষণের কারণে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির, কক্সবাজার শহর এবং পেকুয়ায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গা নারী-শিশুসহ অন্তত ১০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

জানা গেছে, রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের তিনটি স্থানে এবং কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এছাড়া সোমবার বিকেলে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নে আরেকটি পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় মিনহাজ (৬) নামে এক শিশু।

উখিয়ার জামতলী ক্যাম্পে একই পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু

রোববার দিবাগত রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে আশ্রিত মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, উদ্ধার অভিযানে তিনজনকে মৃত এবং দুজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে আরও ৫ জনের প্রাণহানি

একই রাতে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়।

রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে নিহত হন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন।

কক্সবাজার শহরে নিহত ১

কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাত্তার ঘোনা এলাকায় সোমবার ভোরে পাহাড়ধসে একই পরিবারের তিনজন চাপা পড়েন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে আলী আকবর নামে একজনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

পেকুয়ায় পাহাড়ধসে শিশুর মৃত্যু

সোমবার বিকেল ৪টার দিকে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের খুন্যাভিটার আলিম্মার ঝিরি এলাকায় পাহাড়ধসে মিনহাজ (৬) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তার নানি জান্নাতুল ফেরদৌস (৬৫) গুরুতর আহত হয়েছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় একটি গাছ ভেঙে বসতঘরের ওপর পড়ে। গাছের ডাল সরানোর সময় হঠাৎ পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে তাদের ওপর।

প্রশাসনের সতর্কবার্তা

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, সকাল থেকেই উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ত্যাগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঝুঁকিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, যেসব এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে সেখান থেকে আগেও রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে নতুন আসা অনেক রোহিঙ্গা আবার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস শুরু করেছে। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়রা পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণ করে রোহিঙ্গাদের ভাড়া দিয়েছেন, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।

আরও দুই দিন ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী অন্তত দুই দিন একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।

প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা ও রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় কেটে বা খাড়া ঢালে নির্মিত বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। টানা বর্ষণে মাটি নরম হয়ে গেলে মুহূর্তেই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে, যা প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ।