শেখ হাসিনা: ‘দেশের মানুষের পাশে থাকার দায়িত্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবসর নয়’
ঢাকা/নয়াদিল্লি, ৯ জুন: ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর একসময় রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে জনগণ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার নয়াদিল্লি থেকে ভারতীয় বাংলা দৈনিক এই সময়-কে দেওয়া এক দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে মানুষের দুঃসময়ে পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “১৯৮১ সালে সব হারিয়ে দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগের কর্মীরাই ছিল আমার পরিবার। আজ সেই নেতা-কর্মীরা নির্যাতিত, দেশের মানুষ সংকটে। আমি কীভাবে তাদের ছেড়ে বিশ্রামে যাই?”
রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার প্রসঙ্গটি নতুন করে আলোচনায় আসে তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়-এর এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। এ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জয়ের বক্তব্য তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতিফলন। তিনি বহুবার নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন এবং আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কাউন্সিলগুলোতেও তরুণদের নেতৃত্বে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় অবসরের চিন্তা আপাতত স্থগিত রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। গণতন্ত্র আক্রান্ত, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করার আইন করা হয়েছে, নেতা-কর্মীরা কারাগারে বা ঘরছাড়া। সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে। এমন সময়ে আমি কীভাবে বলি, আমি অবসর নিচ্ছি?”
ক্ষমতা নয়, জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধই তাঁকে সক্রিয় রাজনীতিতে রাখছে বলে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা, উন্নত জীবনমান, অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিশ্চিত করে এবং আওয়ামী লীগের নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই আমি অবসর নেব।”
দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো ব্যক্তিগত উত্তরাধিকারভিত্তিক দল নয়। কাউন্সিলের মাধ্যমে কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে যোগ্য, ত্যাগী ও আদর্শিক নেতৃত্বই নির্বাচিত হবে।
তিনি আরও বলেন, “নেতৃত্ব কোনো অলঙ্কার নয়, এটি একটি পবিত্র দায়িত্ব। যারা কঠিন সময়ে কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে পারবেন না বা সংগঠনকে ধরে রাখতে পারবেন না, তাদের বিষয়ে দলীয় কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
তবে আপাতত নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। শেখ হাসিনা জানান, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এলে নতুন কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠিত করা হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা হবে।
তরুণ নেতাদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ধরনের নির্যাতন মোকাবিলা করেও যারা আওয়ামী লীগের পতাকা ধরে রেখেছেন, তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ।”
বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকেরা পারেনি, খুনিরা পারেনি, ষড়যন্ত্রকারীরা পারেনি—আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না। আমার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত।”
তিনি পুনরায় দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, দেশের জনগণের স্বার্থ, গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকবেন।

