হার মানতে নারাজ মমতা, পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের তোড়জোড়—রাজনীতিতে শুরু নতুন সমীকরণ

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, তাঁরা ভোটে হারেননি; বরং চক্রান্তের মাধ্যমে প্রায় ১০০টি আসন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ তুলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং রাজভবনেও যাবেন না—এমনকি নির্দেশ দেওয়া হলেও তা মানবেন না।
এদিকে পরিস্থিতি যাই হোক, সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটির পরিষদীয় বৈঠকে অংশ নিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় আসছেন বলে জানা গেছে। বিধায়কদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচনের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ নেবেন।
নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত মমতার এমন অবস্থানের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ভোট গণনার দিন ভবানীপুর কেন্দ্রে ফল প্রতিকূল হতে শুরু করলে তিনি গণনাকেন্দ্র ত্যাগ করেন এবং পরে নিজের কালীঘাটের বাসভবনে চলে যান। পরদিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেন।
মমতার এই অবস্থান অনেকেই তুলনা করছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর সঙ্গে, যিনি ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেন–এর কাছে পরাজয়ের পর ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতার পদত্যাগ না করার ঘোষণা কোনো সাংবিধানিক সংকট তৈরি করবে না। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৭ মে। এরপর তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আর মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন না। ফলে পদত্যাগের প্রশ্নটি কার্যত গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে।
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার দাবি করা বিজেপি শিগগিরই নতুন সরকার গঠন করবে। সম্ভাব্যভাবে ৯ মে, রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে সাময়িকভাবে রাজ্যপাল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এদিকে রাজনৈতিক মহলে এখন বড় প্রশ্ন—পরাজয়ের পর মমতার ভবিষ্যৎ কী? তিনি কি নতুন করে লড়াইয়ে নামবেন, নাকি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন?
পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজ্য রাজনীতিতে আপাতত তাঁর পক্ষে পুনরুত্থান কঠিন। জনঅসন্তোষ, বিজেপির শক্তিশালী অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কড়া নজরদারি তৃণমূলকে চাপে রাখবে। ফলে মমতার সামনে এখন জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এদিকে বিরোধী জোটের রাজনীতিতেও আসতে পারে বড় পরিবর্তন। এতদিন কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রতি অনাগ্রহ দেখালেও, পরাজয়ের পর মমতা হয়তো নতুন করে সম্পর্ক গড়তে বাধ্য হবেন। ইতোমধ্যে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে সমর্থন জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিতই দিচ্ছে না, বরং ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরির আভাস দিচ্ছে।
