চলমান সংবাদ

জাহাজভাঙা শিল্প: হংকং কনভেনশন অনুস্বাক্ষরের দুই বছর পূর্তিতে টেকসই উন্নয়ন, শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে

-ফজলুল কবির মিন্টু

২০২৩ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে হংকং কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করেছিল। জাহাজপুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে এই অনুস্বাক্ষর ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নিয়ম অনুযায়ী, অনুস্বাক্ষরের দুই বছরের মধ্যে কনভেনশন বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক—অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুনেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে। এই প্রান্তিক মুহূর্তে এসে প্রশ্ন উঠেছে: আমরা কি প্রস্তুত?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন জাহাজভাঙা শিল্প

বিশ্বের প্রায় ৯২% জাহাজভাঙা কার্যক্রম এশিয়ার চারটি দেশে—বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কে—সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজভাঙা ক্ষেত্র’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের শিপব্রেকিং শিল্প ১৯৮০’র দশক থেকে বার্ষিক গড় ১৪% হারে প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে।

এই শিল্প থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০-২৫ লাখ টন রি-রোলেবল স্ক্র্যাপ সংগ্রহ করা হয়, যা দেশের নির্মাণ খাতের ইস্পাত চাহিদার প্রায় ৬০% পূরণ করে। এছাড়া, পুরনো জাহাজ থেকে সংগৃহীত যন্ত্রাংশ, মোটর, জেনারেটর, পাম্প, প্লেট, কাঠামোগত উপাদান, আসবাবপত্র এবং লুব্রিকেটিং তেলসহ নানা ধরনের সামগ্রী স্বল্পমূল্যে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহৃত হয়—যা একদিকে উৎপাদন খরচ কমায়, অন্যদিকে পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলে।

বর্তমানে এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৫-৫০ হাজার শ্রমিক নিয়োজিত আছেন এবং শিল্পটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হাজারো স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী, ট্রান্সপোর্টার, কারখানা মালিক, রিসাইক্লিং ও রি-রোলিং ইন্ডাস্ট্রি। ফলে শুধু উৎপাদন নয়, কর্মসংস্থান এবং উপখাতসমূহের মাধ্যমে এ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক অবদান রাখছে।

সরকারের জন্যও এই শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব খাত, যেখান থেকে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট এবং অন্যান্য ফিস বাবদ প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। সার্বিকভাবে বলা যায়, জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ স্বাস্থ্যঝুঁকি

তবে এই শিল্পের উল্টো চিত্রটিও ভয়াবহ। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীতাকুণ্ড উপকূলে প্রতি কেজি মাটিতে ১৯৭.৭ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সিসা, ২২.১২ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম, ৪,৪৩০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত তেলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০১০ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে জমাট হতে পারে ৭৯,০০০ টন অ্যাসবেস্টস, ২৪০,০০০ টন পিসিবি, প্রায় ২০ লাখ কিউবিক মিটার তরল জৈব বর্জ্য এবং আরও বহু বিপজ্জনক রাসায়নিক উপাদান। সাইক্লোন বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এসব উপাদান ছড়িয়ে পড়লে তা উপকূলীয় পরিবেশে ভয়াবহ দূষণের আশঙ্কা তৈরি করে।

শ্রমিকদের জীবন নিরাপত্তা

বিগত ৬ মাসে ১৬টি দুর্ঘটনায় ১ জন শ্রমিক নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কেউ মাথায়, কেউ ঘাড়ে, আবার কেউ চোখে আঘাত পেয়েছেন। নিহত শ্রমিক ছিলেন একজন ইলেকট্রিশিয়ান, যিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। দুর্ঘটনার পর মালিক পক্ষ প্রাথমিক চিকিৎসার পর অনেক সময়ই আহত শ্রমিকদের আর দায়িত্ব নেয় না, ফলে তারা প্রয়োজনীয় ফলোআপ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। অথচ বিদ্যমান শ্রম আইনে এক বছরের মজুরিসহ ছুটি ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় মালিকপক্ষের বহনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দুর্ঘটনায় কেউ স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করলে ২.৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও বাস্তবে তার সঠিক প্রয়োগ দেখা যায় না।

অবিচার, অবহেলা অধিকারহীনতা

শ্রমিকরা নিয়োগপত্র পান না, পরিচয়পত্র নেই; ঠিকাদারদের অধীনে নিয়োগ হওয়ায় দায় নির্ধারণ দুরূহ হয়ে পড়ে। অনেক সময় মাস শেষে মজুরি বকেয়া থেকে যায়, কখনো মৌখিক নির্দেশেই চাকরিচ্যুতি ঘটে। ২০১৮ সালের ঘোষিত নিম্নতম মজুরি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বিএসবিআরএ কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি শ্রমিকদের জন্য।

গ্রিন ইয়ার্ড: আশার আলো, শঙ্কার ছায়া

দেশের সাতটি শিপইয়ার্ড ইতোমধ্যে ‘গ্রীন শিপ ইয়ার্ড’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে এবং আরও কিছু প্রতিষ্ঠান সেই মানদণ্ড অর্জনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে এসব ইয়ার্ডে পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এস এন কর্পোরেশনে সংঘটিত ভয়াবহ দুর্ঘটনা গ্রিন ইয়ার্ডগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কিছুটা হ্রাস পেলেও অন্যদিকে অনেক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। বিকল্প কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকলে এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে একটি বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

টেকসই উন্নয়নের শর্ত: অধিকার দায়িত্বের সমন্বয়

শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, টেকসই জাহাজভাঙা শিল্প গড়তে হলে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার, পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা—এই সকল শর্ত পূরণ করলেই হংকং কনভেনশনের উদ্দেশ্য সফল হবে।

যদি মালিক, শ্রমিক, প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা একসঙ্গে সততা, স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করে, তবে একটি নিরাপদ, মানবিক ও পরিবেশবান্ধব জাহাজভাঙা শিল্প গড়ে তোলা কোনোভাবেই অসম্ভব নয়।

উপসংহার

বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প একদিকে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক, তেমনি অন্যদিকে পরিবেশ ও মানবিক চ্যালেঞ্জে জর্জরিত এক বাস্তবতা। হংকং কনভেনশনের অনুস্বাক্ষরের দুই বছর পূর্ণ হওয়ায় এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনা, মূল্যায়ন এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের।

এই শিল্পের পরিবেশবান্ধব ও শ্রমিকবান্ধব রূপান্তর কেবল আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণের বিষয় নয়—এটি দেশের মানুষের স্বাস্থ্য, উপকূলের ভবিষ্যৎ এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। তাই দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ও মানবিক সমাজ গঠনের অংশ হিসেবে আমাদের জাহাজভাঙা শিল্পে টেকসই উন্নয়নের পথেই অগ্রসর হতে হবে, যেখানে পরিবেশের সুরক্ষা, শ্রমিকের মর্যাদা ও আইনের শাসন একত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সঠিক নীতি, বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ এবং সকল অংশীজনের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে আমরা পারি—এই শিল্পকে একটি মানবিক ও টেকসই উন্নয়নের রোল মডেল করে তুলতে।

 

(লেখক: শ্রমিক অধিকার শিল্প উন্নয়ন বিশ্লেষক)