জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রাম: পরস্পরবিরোধী, নাকি পরিপূরক? -টিটু খন্দকার
![]()
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফী রতনের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। তিনি বলেছেন, “কমিউনিস্টরা যখন সারা দেশে কলে-কারখানায়, ক্ষেত-খামার, চা-বাগানে শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তুলতে ব্যাপৃত, তখন একদল পুরনো সেই খেলায় মেতে উঠেছে। পুরো আন্দোলনকে জাতীয়তাবাদের চোরাবালিতে ডুবিয়ে মারতে চাইছে।”
তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কিংবা পড়াশোনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। তবে উদ্ধৃত বক্তব্যটি জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের সম্পর্ক বিষয়ে কিছু মৌলিক তাত্ত্বিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। সিপিবির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে জাতীয় প্রশ্নে আরও গভীর ঐতিহাসিক ও দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণ প্রত্যাশিত। জাতীয়তাবাদের বুর্জোয়া সীমাবদ্ধতার সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু জাতীয়তাবাদকে নির্বিচারে শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো কতটা মার্ক্সবাদসম্মত?
তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তবে উদ্ধৃত অংশটি জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্নের অবকাশ তৈরি করে। জাতীয়তাবাদের বুর্জোয়া সীমাবদ্ধতা এবং শ্রেণিসংগ্রামের ওপর তার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক রূপ ও রাজনৈতিক চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য না করে তাকে সামগ্রিকভাবে শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা কতটা যথার্থ? বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন এবং বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি আরও গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
শ্রেণিসংগ্রাম কি জাতীয় প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন?
মার্ক্সবাদে শ্রেণিসংগ্রাম কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। উৎপাদনসম্পর্ক ও তার অন্তর্নিহিত শ্রেণিগত দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে, সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র, জাতীয় ও জাতিগত নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক আধিপত্যের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শ্রেণিসংগ্রাম বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা রূপে বিকশিত হয়।
শ্রেণিশোষণ ও জাতীয় নিপীড়ন অভিন্ন বিষয় নয়। কিন্তু ইতিহাসের নির্দিষ্ট পর্যায়ে এ দুটি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। বিশেষত ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অধীনে জাতীয় নিপীড়ন প্রায়ই অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতার সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। ফলে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম অনেক ক্ষেত্রেই শ্রেণিসংগ্রামের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
তবে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে বিভিন্ন শ্রেণির অংশগ্রহণের অর্থ তাদের শ্রেণিস্বার্থের বিলুপ্তি নয়। জাতীয় ঐক্যের মধ্যেও শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও বুর্জোয়ার স্বার্থগত দ্বন্দ্ব বহাল থাকে। মার্ক্সবাদী রাজনীতির দায়িত্ব এই দ্বন্দ্বকে উপলব্ধি করে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের ভেতর শ্রমজীবী মানুষের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম শ্রেণিসংগ্রামের বিকাশের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন করলেই শ্রেণিশোষণের অবসান ঘটে না। জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিমুক্তির সম্পর্ক তাই ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও অভিন্ন নয়।
মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন ও মাও: জাতীয় প্রশ্নের ঐতিহাসিক উপলব্ধি
মার্ক্স ও এঙ্গেলস জাতীয়তাবাদকে নির্বিচারে প্রত্যাখ্যান করেননি। তাঁরা পোল্যান্ডের জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন। আয়ারল্যান্ডের প্রশ্নে মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, আইরিশ জনগণের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্য ইংরেজ শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক চেতনাকেও বিভক্ত ও দুর্বল করে। অর্থাৎ, নিপীড়ক জাতির শ্রমিকশ্রেণির মুক্তিও নিপীড়িত জাতির স্বাধীনতার প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
লেনিন এই উপলব্ধিকে আরও বিকশিত করেন। তিনি নিপীড়ক জাতির আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদ এবং নিপীড়িত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য করেছিলেন। তাঁর কাছে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করা ছিল শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত।
মার্ক্স ও এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইশতেহার-এর ঐতিহাসিক আহ্বান ছিল—‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও!’ পরবর্তী সময়ে লেনিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ঔপনিবেশিক ও নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তিসংগ্রামকে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই রাজনৈতিক উপলব্ধি থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় সেই বিখ্যাত আহ্বান—‘দুনিয়ার শ্রমিক ও নিপীড়িত জাতিসমূহ, ঐক্যবদ্ধ হও!’
১৯২০ সালের ডিসেম্বরে এক বক্তৃতায় লেনিন নিজেই এই সম্প্রসারিত স্লোগান উদ্ধৃত করে তার রাজনৈতিক যথার্থতা সমর্থন করেছিলেন। এটি মার্ক্সবাদের শ্রেণিগত অবস্থান পরিত্যাগের ঘোষণা ছিল না; বরং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগ্রামের সঙ্গে নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তিসংগ্রামকে যুক্ত করার রাজনৈতিক উপলব্ধি।
মাও সেতুংয়ের চিন্তায় জাতীয় মুক্তি ও আন্তর্জাতিকতাবাদের এই সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। জাপানি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চীনের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে ১৯৩৮ সালে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, একজন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদী হয়েও কি দেশপ্রেমিক হতে পারেন? মাওয়ের উত্তর ছিল দ্ব্যর্থহীন—**তিনি শুধু তা হতে পারেনই না, তাঁকে তা হতেই হবে।**
মাওয়ের কাছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেম সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী ছিল না। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির স্বাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন ও মাওয়ের জাতীয় প্রশ্নসংক্রান্ত অবস্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক শিক্ষা তাঁদের চিন্তায় পাওয়া যায়: জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিমুক্তির সম্পর্ককে কোনো যান্ত্রিক সূত্রে নির্ধারণ করা যায় না; তার বিচার করতে হয় সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে।
ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ এবং উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদ কি এক?
এখানে কমরেড কাফী রতনের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই – ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস এবং ভারতীয় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী জাতীয়তাবাদের মৌলিক পার্থক্যগুলো তিনি কতটা বিবেচনায় নিয়েছেন?
ইউরোপে আধুনিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছিল সামন্ততান্ত্রিক সমাজের রূপান্তর, পুঁজিবাদী বাজারের সম্প্রসারণ, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক পরিচয়ের উত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন ধারা ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ, সাম্রাজ্যবাদ এবং জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের হাতিয়ারেও পরিণত হয়েছিল। আবার আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে নিপীড়িত জাতির মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদও বিকশিত হয়েছিল।
অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক জাতীয়তাবাদের একটি প্রধান উৎস ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এখানে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কৃষকের জমির অধিকার, শ্রমিকের শোষণমুক্তি, ঔপনিবেশিক সম্পদ লুণ্ঠনের অবসান এবং জনগণের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও যুক্ত হয়েছিল।
তবে উপমহাদেশীয় জাতীয়তাবাদও কোনো একক রাজনৈতিক ধারা ছিল না। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদ, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মুসলিম জাতীয়তাবাদ, দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং পরবর্তী সময়ে ভাষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে বিকশিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ—এসব ধারার সামাজিক ভিত্তি, রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ঐতিহাসিক পরিণতি এক ছিল না।
আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় জাতীয়তাবাদকে তার ঐতিহাসিক উৎস, সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক চরিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন ধারায় বিশ্লেষণ করা হয়—নাগরিক জাতীয়তাবাদ, জাতিগত জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ এবং বামপন্থী বা সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি। একই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যেও একাধিক প্রবণতা সহাবস্থান করতে পারে। এমনকি ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও শ্রেণিশক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের সঙ্গে একই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক চরিত্রও বদলে যেতে পারে।
সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের অভিজ্ঞতাও এখানে প্রাসঙ্গিক। ভিয়েতনাম ও চীনের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে জাতীয় স্বাধীনতা ও সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। তবে জাতীয় মুক্তির সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি যুক্ত হলেই কোনো আন্দোলন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিকতাবাদী বা গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে না। তার বিচার করতে হয় বাস্তব শ্রেণিচরিত্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং অন্য জাতিসমূহের প্রতি তার আচরণের ভিত্তিতে।
কমরেড রতন আসলে কোন জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন? বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে, আধিপত্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে, নাকি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধেও?
আমি যা বলতে চাই তা হলো, জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক চরিত্র তার নাম দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার ঐতিহাসিক উৎস, শ্রেণিগত ভিত্তি, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং বাস্তব সামাজিক ভূমিকার মধ্য দিয়ে। জাতীয়তাবাদের বুর্জোয়া সীমাবদ্ধতার সমালোচনা এবং জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।
উপমহাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামের ঐতিহাসিক সম্পর্ক
ভারতীয় উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমান্তরালেই এখানে শ্রমিক-কৃষকের শ্রেণিভিত্তিক সংগ্রাম বিকশিত হয়েছিল। ১৯২০-এর দশক থেকে শ্রমিক সংগঠন, কৃষক আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির বিস্তার ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রামকে নতুন সামাজিক ভিত্তি দিয়েছিল।
বাংলার তেভাগা আন্দোলনে ভাগচাষিরা জোতদারি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলেন। তেলেঙ্গানার কৃষক সংগ্রাম সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এসব আন্দোলন জাতীয় স্বাধীনতার বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না; আবার জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্বের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেদের আবদ্ধ রাখেনি।
তবে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে জাতীয় প্রশ্নে গুরুতর তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বিভ্রান্তিও দেখা গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টির ‘জনযুদ্ধ’ নীতি এবং ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত জাতীয়তাবাদী গণআন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।
একইভাবে, দেশভাগের প্রাক্কালে গঙ্গাধর অধিকারীর রিপোর্টে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে গৃহীত অবস্থান এবং মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দেয়। জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক জাতিসত্তা এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার পার্থক্য নির্ধারণে এই অভিজ্ঞতা আজও আলোচনার দাবি রাখে।
এই ইতিহাসের শিক্ষা হলো, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক অন্ধ অনুসরণ কিংবা নির্বিচার বিরোধিতার নয়। জাতীয় মুক্তির প্রগতিশীল উপাদানগুলোকে ধারণ করেও শ্রমিক-কৃষকের স্বতন্ত্র শ্রেণিস্বার্থ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা: জাতীয় মুক্তি থেকে শ্রেণিমুক্তির অসমাপ্ত সংগ্রাম
পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসেও জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিসংগ্রামের আন্তঃসম্পর্ক স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বিকশিত হয়েছিল। এর পেছনে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নের পাশাপাশি ছিল রাজনৈতিক অধিকারহীনতা, আঞ্চলিক শোষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সম্পদ বণ্টনের অন্যায্যতা। অর্থাৎ, বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মধ্যেই শ্রেণিগত অসন্তোষের শক্তিশালী উপাদান উপস্থিত ছিল। কমিউনিস্টদের দায়িত্ব ছিল এই জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শ্রমিক-কৃষকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা।
কিন্তু ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জিত হলেও উৎপাদনসম্পর্ক ও সম্পদের ওপর শ্রেণিগত নিয়ন্ত্রণের মৌলিক রূপান্তর ঘটেনি। ফলে জাতীয় মুক্তির পরবর্তী ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির দিকে এগিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতা এখানেই। স্বাধীনতার পর শ্রমিক-কৃষকের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা, জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা এবং মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বামপন্থীরা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই ব্যর্থতার দায় কেবল জাতীয়তাবাদের ওপর চাপিয়ে দিলে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দুর্বলতার আত্মসমালোচনা আড়ালে পড়ে যায়। বরং প্রশ্ন করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন কেন শ্রমিক-কৃষকের মধ্যে শক্তিশালী ও স্থায়ী রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করতে পারেনি? পরিবর্তিত উৎপাদন ব্যবস্থা, অনানুষ্ঠানিক খাত, অভিবাসী শ্রমিক, অ্যাপভিত্তিক কর্মী এবং শিক্ষিত বেকার তরুণদের নতুন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পেরেছে?
শ্রেণিসংগ্রামের কথা উচ্চারণ করা আর বাস্তবে শ্রেণিসংগ্রামের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। শ্রেণিসংগ্রামকে কেবল কারখানার মালিক ও শ্রমিকের অর্থনৈতিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার, ধর্মীয় আধিপত্য, সাম্রাজ্যবাদী নির্ভরতা এবং জাতীয় নিপীড়নের প্রশ্নগুলো আড়ালে পড়ে যায়। অথচ এসব প্রশ্নও শ্রেণিশক্তির ভারসাম্য ও রাজনৈতিক সংগ্রামের গতিপথকে প্রভাবিত করে। জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন থেকে শ্রেণিসংগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করা মার্ক্সবাদী রাজনীতিকে একধরনের সংকীর্ণ অর্থনীতিবাদে নামিয়ে আনার ঝুঁকি তৈরি করে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও অন্যান্য জাতিসত্তার অধিকার
আমাদের বামপন্থীদের একটি অংশের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা রয়েছে- এই জাতীয়তাবাদ যথেষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়; বাংলাদেশের আদিবাসী ও অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষ এর বাইরে থেকে গেছেন।
এই সমালোচনার ঐতিহাসিক ভিত্তি অস্বীকার করা যায় না। পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ভাষাগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুক্তিকামী চরিত্র নিয়ে বিকশিত হয়েছিল, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় জাতীয় পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়। বিশেষত অ-বাঙালি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় ও অধিকারের প্রশ্নে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয় পরিচয়কে সর্বজনীন করার প্রবণতা দেখা যায়।
কিন্তু এখানেও কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় কীভাবে নির্ধারণ করেন? তাঁরা কি নিজেদের স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে স্বীকৃতি চান, নাকি আদিবাসী পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার, ভাষা-সংস্কৃতির সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাধিকার দেন? নাকি এসব দাবি তাঁদের আন্দোলনে একই সঙ্গে উপস্থিত?
আদিবাসী পরিচয় ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তার পরিচয় পরস্পরবিরোধী নয়। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাও এক নয়। তাঁদের নিজস্ব মতামত ও দাবিকে উপেক্ষা করে বাইরে থেকে কোনো একক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই প্রশ্নে সিপিবির সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন কী, সেটি জানা প্রয়োজন। পার্টি কি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক মুক্তিকামী চরিত্র এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ দেখতে পায়? নাকি এই দুই বাস্তবতার মধ্যে গণতান্ত্রিক সমন্বয়ের সম্ভাবনার কথা ভাবে? জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ, আদিবাসী অধিকার, স্বায়ত্তশাসন এবং অভিন্ন রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্বের প্রশ্নে পার্টির অবস্থান কী?
বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক প্রগতিশীল ভূমিকা স্বীকার করা এবং অন্যান্য জাতিসত্তার আত্মপরিচয় ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা পরস্পরবিরোধী হওয়ার কোনো অনিবার্য কারণ নেই। জাতীয় মুক্তির গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকারকে বিকশিত করতে হলে এই প্রশ্নগুলোর রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
বর্তমান বাংলাদেশে জাতীয় প্রশ্নের নতুন প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় জাতীয় প্রশ্নটি নতুন তাৎপর্য নিয়ে সামনে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক ধারার শক্তিগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে – এমন প্রেক্ষাপটে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক প্রগতিশীল উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
এখানে জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন নিছক আবেগের নয়। এটি রাষ্ট্রের আদর্শিক চরিত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অর্জন রক্ষার প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হলে শ্রমিকশ্রেণির সংগঠন, প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিসরও সংকুচিত হয়। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা শ্রমজীবী মানুষকে বিভক্ত করতে পারে এবং তাদের অভিন্ন শ্রেণিস্বার্থের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
তাই জাতীয় মুক্তির ঐতিহাসিক অর্জন রক্ষার সংগ্রামকে শ্রেণিসংগ্রামের বিকল্প হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং গণতান্ত্রিক অধিকার, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলো শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
অবশ্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল উত্তরাধিকার ধারণ করার অর্থ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া নয়। কিংবা বাংলাদেশের অন্যান্য জাতিসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয় ও অধিকারের প্রশ্নকে অস্বীকার করাও নয়। জাতীয় চেতনার গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্যই সব নাগরিকের সমান মর্যাদা এবং সব জাতিসত্তার অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আমার বিবেচনায়, আজ বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্বাধীনতা-পরবর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ, এটি এখন কেবল অতীতের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের স্মারক নয়; মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা রক্ষারও রাজনৈতিক প্রশ্ন। আর এই কারণেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্জন করেছে।
‘জয় বাংলা’ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক উচ্চারণ। কোনো রাজনৈতিক দলের অপব্যবহার এই স্লোগানের গণমুক্তির তাৎপর্যকে বাতিল করতে পারে না। আজ ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণের অর্থ কেবল অতীতের বিজয় স্মরণ নয়; জাতীয় মুক্তির অসমাপ্ত গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার। জাতীয় মুক্তির অর্জন রক্ষা এবং শ্রেণিশোষণের অবসান – এই দুই সংগ্রামকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো নয়, দ্বান্দ্বিক ঐক্যে বিকশিত করাই আজ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।