সাংবাদিক আলিফের শেষ অনুসন্ধান ঘিরে প্রশ্ন, হত্যার নেপথ্যে কারা?
মাদক কারবার, চোরাচালান, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ও রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান করছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ। হত্যার আগে অপরাধের গডফাদারদের তথ্য-প্রমাণ প্রকাশের ইঙ্গিত দিলেও তা আর প্রকাশ করা হয়নি।
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফের শেষ অনুসন্ধান ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সহকর্মী ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করতে কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশেও সীমান্ত এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন তিনি। মাদক কারবার, চোরাচালান ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনসহ বিভিন্ন অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করছিলেন বলে জানা গেছে।
হত্যার আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ……’ প্রকাশের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আলিফ। কিন্তু সেই তথ্য প্রকাশের আগেই তাকে প্রাণ দিতে হয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কোন অপরাধের তথ্য সামনে আনতে যাচ্ছিলেন এবং তার অনুসন্ধানের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না।
আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ
পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের দাবি, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কারণে আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় এবং নভেম্বরে সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত অঞ্চলে মাদক কারবার, চোরাচালান এবং অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন তিনি। মৃত্যুর আগে তার ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেজেও অপরাধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত ছিল।
তার শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু শনাক্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ব্যক্তিগত নোট, মুঠোফোনের তথ্য, যোগাযোগের ইতিহাস এবং অপ্রকাশিত প্রতিবেদন পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সহকর্মীরা।
রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ
আলিফ হত্যার আগে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে কেন্দ্র করে পাঁচজন রোহিঙ্গা নাগরিকের ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির চেষ্টার অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। নথিপত্র যাচাইয়ের সময় কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এর আগে একই নির্বাচন কার্যালয়ে রোহিঙ্গা নাগরিকের এনআইডি তৈরির অভিযোগে কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। আলিফের ফেসবুক পেজে রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনে ভুয়া তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে অনুসন্ধানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে অবৈধ বালু ব্যবসা ও পাথর উত্তোলন নিয়েও পোস্ট করেছিলেন তিনি।
তবে এনআইডি তৈরির অভিযোগ, সীমান্ত অপরাধ এবং আলিফ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এসব অভিযোগের সত্যতা ও সম্ভাব্য যোগসূত্র তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব।
মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের পুরোনো তথ্য
সীমান্ত অপরাধ ও রোহিঙ্গাদের পরিচয়সংক্রান্ত অভিযোগের আলোচনায় নেত্রকোনা সদরের কে-গাতি ইউনিয়নের চুয়ারকান্দা গ্রামের ইলিয়াস কাদের বাবুলের বিরুদ্ধে অতীতের একটি মাদক মামলার তথ্যও সামনে এসেছে।
২০২২ সালের মে মাসে ময়মনসিংহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে বাবুল, তার রোহিঙ্গা স্ত্রী রোজিনা বেগমসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, মাদক ব্যবসার সুবিধা নিতে বাবুল ওই নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী ও আত্মীয়দের মাধ্যমে টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে ময়মনসিংহে সরবরাহ করা হতো বলেও অভিযোগ ছিল।
বর্তমানে বাবুলকে ঘিরে রোহিঙ্গা স্ত্রী ও তার আত্মীয়দের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা এবং রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরির চেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে আলিফ হত্যার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনা উদ্ঘাটনের দাবি
আলিফ হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তের পরিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। সহকর্মীদের মতে, শুধু সরাসরি হামলাকারীকে শনাক্ত করলেই চলবে না; হত্যার পরিকল্পনা, নির্দেশদাতা, অর্থের জোগান এবং ঘটনার আগে-পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হবে।
পুলিশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আলিফের শেষ অনুসন্ধান, আগে হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা এবং হত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণের দাবি জানিয়েছেন সহকর্মীরা।
তাদের প্রশ্ন—আলিফ কোন তথ্য প্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন? তার অনুসন্ধানের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন? আগের হামলাগুলোর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না? মাদক কারবার, সীমান্ত অপরাধ ও রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আলিফের ডিজিটাল ডিভাইস, ব্যক্তিগত নোট, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রতিবেদন এবং মৃত্যুর আগের কয়েক দিনের যোগাযোগের তথ্য পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে।
গ্রেপ্তার আসামির এক দিনের রিমান্ড
এদিকে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বর এক দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের জ্যেষ্ঠ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া এ আদেশ দেন। এর আগে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুর্গাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি দোকানের সামনে গুলিবিদ্ধ হন আলিফ। পরে তার মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তার শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত ছিল।
ঘটনার পর শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে দুর্গাপুর পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকার পুরোনো সিনেমা হলের পাশ থেকে সাজিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকার শমশের আলীর ছেলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুর্গাপুরে পুলিশের উপপরিদর্শক শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ জানিয়েছেন, সাংবাদিক আলিফ হত্যার কারণ উদ্ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
আলিফের মৃত্যুর পর তার দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে সহকর্মীদের প্রত্যাশা, তদন্তে তার শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু, হত্যার উদ্দেশ্য এবং এর নেপথ্যে অন্য কারও পরিকল্পনা ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি আলিফ যে অপরাধগুলোর তথ্য প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।